বৈষম্যহীন, মেধাভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষাকে সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সংস্কার, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং নগ্ন দলীয়করণের প্রতিবাদে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের(ঢাবি) ডাকসু ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। এতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্র সংস্কারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়:

  • দলীয়করণ ও প্রভাব বলয়: বর্তমান সরকার গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। পিএসসি, ইউজিসি, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পদে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
  • পিএসসির স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ: ৫ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। পরবর্তীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘চায়ের আমন্ত্রণের’ পর আরও দুই সদস্য (ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমান) আকস্মিক পদত্যাগ করেন, যা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি নগ্ন হস্তক্ষেপ।
  • ডিজিটাল জালিয়াতির আশঙ্কা: পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখায় সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে প্রশাসন ক্যাডার থেকে চুক্তিভিত্তিক দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম জালিয়াতি করে মেধার অবমূল্যায়ন ঘটানো।
  • প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে বৈষম্য: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও ১,২০০-র বেশি মেধাবী প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক স্ক্রুটিনি ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে চাকরিপ্রার্থীদের পরিবার ভিন্নমতের (যেমন জামায়াত বা এনসিপি) সাথে যুক্ত কি না, তা খুঁজে বের করে চাকরি আটকে দেওয়া হচ্ছে।
  • ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির চক্রান্ত: মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনরায় ১০০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ করার উদ্যোগ এবং সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আত্মঘাতী প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়।
  • ৪৫তম বিসিএসে মেধাবীদের বঞ্চিতকরণ: পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই ৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে ৫৬ জন চূড়ান্ত মেধাবীকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মেধাভিত্তিক আকাঙ্ক্ষার মুখে এক নির্মম চপেটাঘাত।

সরকারি নিয়োগ ব্যবস্থা ও পিএসসি সংস্কারে ১২ দফা প্রস্তাবনা

সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ১২টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়:

ক) পিএসসি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ:

  1. স্বচ্ছ বাছাই কমিটি গঠন: জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসির কাঠামো পুনর্গঠন করে ৩টি পৃথক কমিশন গঠন করতে হবে। চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে সংসদ ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্বচ্ছ বাছাই কমিটি গঠন করতে হবে।
  2. পিএসসির আওতা বৃদ্ধি ও স্বায়ত্তশাসন: ৯ম ও ১০ম গ্রেডসহ সরকারি সকল চাকরির নিয়োগ পিএসসির অধীনে আনতে হবে। নিয়োগপ্রক্রিয়া ও ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো মহলের অনানুষ্ঠানিক চাপ ও হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে এর আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
  3. মোনেম কমিশনের সংস্কার বহাল: কোডভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন, 'কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ' (CBI), প্রশ্নফাঁস রোধে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস ও ওএমআর (OMR) ট্র্যাকিং এবং যুগান্তকারী ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি বহাল রাখতে হবে।
  4. সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার: মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো নির্ধারিত সময়ে জনবল চাহিদার তথ্য পিএসসিকে সরবরাহ করবে এবং এর ভিত্তিতে পিএসসি একটি সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করবে।
  5. ১২ মাসের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন: বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে।
  6. রাজনৈতিক বৈষম্য অবসান: রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা বা কোনো সংগঠনের সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে প্রার্থীকে বৈষম্যের শিকার করা যাবে না। সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত না হলে কাউকে বাদ দেওয়া যাবে না।

খ) পুলিশ ভেরিফিকেশন ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা:

  1. ভেরিফিকেশনের লিখিত মানদণ্ড: সাধারণ সরকারি নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য, যাচাইয়ের মানদণ্ড ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে প্রকাশ করতে হবে।
  2. ডিজিটাল ও দ্রুত ভেরিফিকেশন: জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং প্রাসঙ্গিক অপরাধসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
  3. আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ: ভেরিফিকেশনে কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে এবং আপিল বা পুনর্বিবেচনার কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে।
  4. অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো: মৌখিক পরীক্ষার জন্য অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো, নির্ধারিত মানদণ্ড এবং পরীক্ষকদের মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  5. ভাইভার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ: মৌখিক পরীক্ষার অস্বচ্ছতা দূর করতে এবং পরীক্ষকদের মূল্যায়নে অসঙ্গতি খতিয়ে দেখতে ভাইভা পরীক্ষার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী আপিল করার সুযোগ পান।
  6. আধুনিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা: প্রশ্নফাঁস ও প্রক্সি পরীক্ষা প্রতিরোধে নিরাপদ প্রযুক্তি, ডিজিটাল নজরদারি এবং পিএসসির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ জনবল নিয়োগ করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে বলা হয় যে, সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত কর্মীদের পুরস্কৃত করার জায়গা নয়, এটি রাষ্ট্রের সেবা করার পবিত্র দায়িত্ব। নিয়োগের ভিত্তি হতে হবে কেবলই যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততা। পরিশেষে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।