সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে জাতিসঙ্ঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তরণের সময় সীমা পুনঃনির্ধারণ করেছে। নতুন সময়সীমা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবে। এ বছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তরণের কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির অভিঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার সময়সীমা তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। এ তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসমূহ কাটিয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। যে কোন দেশের জন্য উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং পরবর্তীতে উন্নত দেশের কাতারে সামিল হতে পারাটা অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। কোন দেশই চিরদিন দরিদ্র হয়ে থাকতে চায় না। দরিদ্র দেশের তেমন কোন মর্যাদা থাকে না। তাই প্রতিটি দেশই চেষ্টা করে কিভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা যায়।

বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় স্থান দেয়া হয় ১৯৭৫ সালে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করতে থাকলে ২০০১-২০০৬ সময়কালে বিএনপি-জামায়াত জোট রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অবস্থায় এক পর্যায়ে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ করার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা হারানো,স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবার ভয়ে তৎকালীন সরকার উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের বিষয়ে আগ্রহ প্রদর্শন করেছি। উল্লেখ্য, উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হলে একটি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারায়। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের নিকট থেকে যে ঋণ পাওয়া যায় তার সুদের হার অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। অভ্যন্তরীণভাবে কৃষি এবং এ ধরনের সনাতনী উৎপাদন ব্যবস্থায় ভর্তুকি প্রদান বন্ধ করতে হয়। মূলত এসব কারণেই বাংলাদেশ আগে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার ব্যাপারে তেমন কোন আগ্রহ প্রদর্শন করেনি। ৪৩ বছর স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকার পর ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা অর্জন করে। মোট তিনটি শর্ত পরিপালন করলেই একটি দেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার যোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়।

২০২১ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার যোগ্যতা অর্জন করে। বাংলাদেশকে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ করার জন্য সুপারিশ করা হয়। কিন্তু করোনার কারণে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণের সময় আরো ২ বছর বাড়ানো হয়। সে হিসেবে এবছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। কিন্তু নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণের সময়সীমা আবারো তিন বছর বাড়ানোর জন্য আবেদন করে। সে মোতাবেক আগামী ২০২৯ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণের নতুন সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় একটি সংগঠন বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণের সময়সীমা ১০ বছর বাড়ানোর দাবি করেছিল। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতি উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হবার মতো অবস্থানে নেই। অপ্রস্তুত অবস্থায় উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তীর্ণ হলে ভালোর চেয়ে মন্দ হবার আশঙ্কাই বেশি।

বাংলাদেশ এমন এক জটিল সময়ে উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে যখন দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিগত ফ্যাসিবাদি সরকার আমলে দেশের অর্থনীতির প্রতিটি সেক্টরকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। ‘অতি উন্নয়নের নামে অতি দুর্নীতি’র মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় ট্যাগফ্লেশন বলতে এমন একটি অবস্থাকে বুঝায় যখন একটি দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান থাকে। বিনিয়োগ মন্থরতা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম গতি হারিয়ে ফেলে। স্বাভাবিক অবস্থায় উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেখা দিলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ট্যাগফ্লেশনের সময় তার সম্পূর্ণ উল্টোটিই ঘটে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করছেন, দেশের অর্থনীতি ক্রমশ ট্যাগফ্লেশেন দিকে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে যেসব প্রাক্কলন করছে তা মোটেও সুখকর নয়।

ইন্টারন্যাশনাল মানিটারিং ফান্ড (আইএমএফ) বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে যে প্রাক্কলন প্রকাশ করেছে তাতে ট্যাগফ্লেশনের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। সংস্থাটি বলেছে, চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২০২৭) বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে। পরবর্তী দুই বছর যথাক্রমে ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। ২০২৯-২০৩০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০৩০-২০৩১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। পরবর্তী বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তার গতি থাকবে খুবই মন্থর। গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিতক ১৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬শতাংশ। এটা অর্জিত হবার কোন সম্ভাবনা নেই। চলতি অর্থবছরের জন্য আইএমএফ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করেছে তা বিগত সাড়ে ৩ দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সংস্থাটি একই সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা,নেপাল ভুটান, মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধির বিষয়েও তথ্য দিয়েছে। তাদের মতে, চলতি অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৭ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতির হার থাকবে ৪দশমিক ৪ শতাংশ। পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে সাড়ে তিন শতাংশ। শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে ৩দশমিক ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির হার থাকবে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। নেপালের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশে সীমিত থাকবে। মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি হতে পারে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ও আড়াই শতাংশ। ভুটানের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি থাকবে সাড়ে ৬ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের প্রবৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির কাছাকাছি থাকবে। একমাত্র বাংলাদেশেই প্রবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আগামী বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাবার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই।

প্রবৃদ্ধি হ্রাস, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাবার ফলে দেশে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত অর্থবছরে ১৯ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেছে। এ নিয়ে গত ৪ বছরে মোট ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেল। জাতীয় দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭শতাংশ। গত অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠে আসে। চলতি অর্থবছরে তা ২২ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। আয় বৈষম্য প্রকটভাবে বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না বরং কমছে। ফলে সাধারণ নিম্ন আয়ের এবং নির্দিষ্ট আয়ের আনুষগুলো বড়ই অসহায় অবস্থার মধ্যে পাতিত হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বল খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ব্যাংকিং খাতকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ব্যাংকিং সেক্টরে যে দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা উত্তরণের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্যাংকিং সেক্টরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। এখন তা ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বিপুল পরিমাণ অবলোপনকৃত ঋণ, পুন:তফসিলকৃত ঋণ এবং মামলাধীন প্রকল্পগুলোর নিকট পাওনা ঋণের পরিমাণ যেপাগ করলে নন-পারফমির্ং লোনের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি চলে যাবে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণগ্রস্ত খাত। ঋণ খেলাপি সমস্যার কারণে দেশের ব্যাংকিং সেক্টর উদ্যোক্তাদের চাহিদাকৃত ঋণের যোগান দিতে পারছে না। ব্যক্তি খাতে ব্যাংকিং সেক্টরের ঋণ প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের হার ছিল জিডিপি’র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। এটা বিগত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিদেশি গ্রিন ফিল্ড বিনিয়োগের হার এক বছরে কমেছে ১৫শতাংশ। যদিও পুন:বিনিয়োগ বেড়েছে। জ্বালানি তেলের দুষ্প্রাপ্যতা, উৎপাদন উপকরণের উচ্চ মূল্যসহ নানা কারণে বিদ্যামন কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে। অনেক কারখানা তাদের কর্মী ছাঁটাই করেছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়ে বা কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে ব্যয় সাশ্রয় করার চেষ্টা করছে।

বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। এটা করতে হলে প্রতি বছর গড়ে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে হবে ৮ থেকে ৯ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে গতি তাতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা বিরাজ করছে তার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি। সঠিক সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্র¿ণে লাগসই ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হবার বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুরু হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৪০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) একাধিকবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে ব্যাংক ঋণের লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে অন্যান্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা করে এবং এক পর্যায়ে তারা সফল হয়। পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমিয়ে আনা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একটি বহুল আলোচিত পদ্ধতি। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি পলিসি রেট বৃদ্ধি করে তাহলে সিডিউল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পকালীন ঋণ বা ধার গ্রহণের খরচ বৃদ্ধি পায়।

পরবর্তীতে সিডিউল ব্যাংকগুলো যখন সাধারণ গ্রাহক বা উদ্যোক্তা পর্যায়ে ঋণ প্রদান করে তারাও সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এতে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমে যায়, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। সে সময় বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। পলিসি রেট বৃদ্ধি ও অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দেশগুলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে সমর্থ হলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়। আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ। পরবর্তীতে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। বর্তমানে পলিসি রেট হচ্ছে সাড়ে ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করলেও অনেক দিন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদ হার ৯ শতাংশ ফিক্সড করে রেখেছিল। ফলে ব্যাংক ঋণের সুদের হার উচ্চ মূল্যস্ফীতির তুলনায় সস্তা হয়ে যায়। এতে একটি বিশেষ মহল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা উদ্দীষ্ট প্রকল্পে ব্যবহার না করে অন্যখাতে তথা অনুৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করে। এতে বাজারে অর্থ সরবরাহ বেড়ে যায়। অর্থাৎ মুদ্রাস্ফীতিজনিত মূল্যস্ফীতির সৃষ্টি হয়। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনা এবং পণ্য সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ যদি উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত তালিকায় উত্তীর্ণ হয় তাহলে বিপদ আরো বাড়বে।

লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।