ইয়েমেনের সঙ্ঘাত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এমন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক নৌ বাণিজ্যের স্বার্থ পরস্পরের সাথে জড়িয়ে পড়েছে। হাউছিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, সৌদি নেতৃত্বাধীন পাল্টা অভিযান এবং বাব আল-মানদেব প্রণালীসংলগ্ন এলাকায় লড়াই বৃহত্তর আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এর সাথে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৯ অক্টোবর ২০২৬ জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ নিরাপত্তা পরিষদকে সতর্ক করেন, ইয়েমেন আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরে গেছে।
এই বিপর্যয়ের শিকড় কয়েক দশকের রাজনৈতিক বিভাজন, বৈষম্য ও দুর্বল শাসনব্যবস্থায় নিহিত। উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন ১৯৯০ সালে একীভূত হলেও ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়। ১৯৯৪ সালের গৃহযুদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলের অসন্তোষ আরো গভীর করে। কেন্দ্রীভূত শাসন, দুর্নীতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। ২০১১ সালের গণ-আন্দোলনের পর আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়লেও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমাধান দিতে পারেনি। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে উত্তরাঞ্চলভিত্তিক জায়দি শিয়া আন্দোলন আনসার আল্লাহ বা হাউছিরা ২০১৪ সালে সানা দখল করে।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক হস্তক্ষেপ সঙ্ঘাতকে আঞ্চলিক রূপ দেয়। সৌদি আরবের উদ্বেগ ছিল দক্ষিণ সীমান্তে ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র শক্তির প্রতিষ্ঠা; অন্য দিকে হাউছিদের প্রতি ইরানি সহায়তা তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ায়। তবে হাউছিদের সম্পূর্ণভাবে তেহরানের নির্দেশাধীন শক্তি হিসেবে দেখলে স্থানীয় বাস্তবতা আড়াল হয়। তাদের নিজস্ব নেতৃত্ব, সামাজিক ভিত্তি ও রাজনৈতিক লক্ষ্য রয়েছে। একইভাবে সরকারপন্থী শিবিরও ঐক্যবদ্ধ নয়। দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি এবং সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিন্ন অংশীদার নির্বাচনে সঙ্ঘাত আরো জটিল হয়েছে।
বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে সৌদি নিরাপত্তা, ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারের বিধিনিষেধ এবং লোহিত সাগরের নিয়ন্ত্রণ। সেপ্টেম্বরের হাউছি অগ্রযাত্রার পর অক্টোবরের শুরুতে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা অভিযান শুরু করে। জাতিসঙ্ঘের হিসাবে তায়েজ, লাহজ, মারিব, আল-জাওফ ও হাজ্জাসহ একাধিক এলাকায় লড়াই ছড়িয়ে পড়ে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, ড্রোন হামলা ও পাল্টা বিমান অভিযানের খবর আসে। কোনো পক্ষের ভূখণ্ড দখল কিংবা সামরিক সাফল্যের দাবিকে স্বাধীন যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়।
এ পরিস্থিতি অনিবার্য ছিল না। সময়মতো বাস্তবসম্মত সমঝোতা হলে সঙ্ঘাতের তীব্রতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব ছিল। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি বড় ধরনের লড়াই সীমিত করেছিল এবং রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু সেই সুযোগ স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ নেয়নি। জাতিসঙ্ঘের বিশেষ দূতও জানিয়েছেন, আলোচিত রোডম্যাপ কার্যকর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়নি; রাজনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া সামরিক স্থিতাবস্থা টেকসই হতে পারে না।
সৌদি আরবের অনমনীয়তা শান্তির সুযোগ নষ্ট করেছে, এমন সমালোচনা তাই গুরুত্ববহ। সামরিক শক্তি ও বিধিনিষেধের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে সুবিধাজনক সমঝোতা আদায়ের কৌশল কতটা কার্যকর হয়েছে, রিয়াদের তা মূল্যায়ন করা উচিত। দীর্ঘ সঙ্ঘাতেও হাউছিদের নির্মূল করা যায়নি; বরং তারা সীমান্ত পারের হামলার সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়ার একমাত্র কারণ সৌদি অনমনীয়তা, এটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়। নির্দিষ্ট আলোচনায় কোন প্রস্তাব কে প্রত্যাখ্যান করেছে, তার নির্ভরযোগ্য বিবরণ ছাড়া একক দায় নির্ধারণ অসম্পূর্ণ হবে। হাউছিদের হামলা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ইয়েমেনি পক্ষগুলোর বিভাজনও বড় প্রতিবন্ধকতা।
সৌদি আরবের সীমান্ত ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে। একই সাথে ইয়েমেনের জনগণের খাদ্য, চিকিৎসা, চলাচল ও জীবিকার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে। সম্ভাব্য সমঝোতার ভিত্তি হতে পারে সীমান্ত পারের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধ, পাল্টা বিমান অভিযান স্থগিত, বাণিজ্যিক নৌযানের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক তদারকিতে বন্দর ও বিমানবন্দর ব্যবহারের ব্যবস্থা। কোনো এক পক্ষকে আগে সম্পূর্ণ ছাড় দিতে বলার পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে পারস্পরিক পদক্ষেপ আস্থা বাড়াতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক এ চুক্তি স্বাক্ষর করে। একটি সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে তিন রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনার অঙ্গীকার এতে রয়েছে। ৫ অক্টোবর রিয়াদে জরুরি বৈঠকে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা বাস্তবায়ন এবং সম্মত সামরিক শক্তি ও সক্ষমতা সৌদি আরবে দ্রুত মোতায়েনের ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রকৃত মোতায়েন এবং ইয়েমেনের ভেতরে সরাসরি যুদ্ধ করা পৃথক বিষয়।
তুরস্কের সহায়তা সম্পর্কে অক্টোবরের প্রতিবেদনে মূলত প্রতিরক্ষামূলক ও কারিগরি সহযোগিতার কথা বলা হয়। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত তুর্কি সংসদীয় কমিটি চুক্তি অনুমোদন করলেও পূর্ণ সংসদের অনুমোদন বাকি ছিল বলে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানায়। ফলে পাকিস্তান ও তুরস্ক ইতোমধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে প্রবেশ করেছে— এমন সিদ্ধান্ত সমর্থিত নয়; বরং এসব দেশ সৌদি প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার পাশাপাশি ইরানের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখে সঙ্ঘাত প্রশমনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবে ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে অস্ত্র, গোয়েন্দা ও অন্যান্য সামরিক সহায়তা দিয়েছে; পাশাপাশি হাউছিদের বিরুদ্ধে নিজেও হামলা চালিয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে সৌদি অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা ও লক্ষ্য শনাক্তকরণ সহায়তা বৃদ্ধির কথা আসে। সে সময় কর্মকর্তারা নতুন সরাসরি মার্কিন হামলার পরিকল্পনা নেই বলে জানালেও পরিস্থিতি বদলানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তাই যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু দূরবর্তী সহায়ক হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; আবার তার প্রতিটি সহায়তাকে নতুন প্রত্যক্ষ যুদ্ধের প্রমাণ হিসেবেও দেখানো উচিত নয়।
ইরানকে উপযুক্ত আঞ্চলিক আলোচনা কাঠামোয় যুক্ত করা বাস্তবসম্মত। হাউছিদের সাথে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক প্রভাবের কারণে তেহরানকে সম্পূর্ণ বাইরে রেখে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন। আলোচনা মানে ইরানের সব কর্মকাণ্ড অনুমোদন করা নয়; বরং তার দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতিকে যাচাইযোগ্য কাঠামোয় আনা। তবে সৌদি-ইরান সমঝোতা ইয়েমেনিদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, হাউছি, দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইয়েমেনি পক্ষকে সমাধানের কেন্দ্রে রাখতে হবে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সঙ্ঘাতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনের উত্তেজনা বিশেষ বিপজ্জনক। ২৬ অক্টোবর তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আবার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়া রোধ। এই ভঙ্গুর কূটনৈতিক পরিবেশে ইয়েমেনে বড় হামলা নতুন পাল্টা অভিযানের জন্ম দিতে পারে এবং আঞ্চলিক সমঝোতার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ঝুঁকিটি হলো ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া : হাউছি হামলার পর ব্যাপক সৌদি অভিযান, এরপর বাড়তি ইরানি সহায়তা কিংবা মার্কিন ও মিত্রদেশগুলোর সম্পৃক্ততা। এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশ্লেষণ, অবধারিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এমন বিস্তার ঠেকাতে জরুরি সামরিক যোগাযোগ, হামলার ঘটনা যাচাই এবং ভুল বোঝাবুঝি নিরসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাব আল-মানদেব ও হরমুজ একই সাথে অনিরাপদ হলে জ্বালানি, পরিবহন ও খাদ্য সরবরাহে বৈশ্বিক চাপ বাড়তে পারে; বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশও তার প্রভাব অনুভব করবে। সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ। ২৯ অক্টোবর রয়টার্স জানায়, হাসপাতালে ওষুধ, অক্সিজেন ও জ্বালানির সঙ্কট তীব্র হয়েছে এবং আগস্ট থেকে প্রায় দুই লাখ ৮১ হাজার মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সামরিক সাফল্যের প্রতিটি দাবির পাশে এই মানবিক বাস্তবতা রাখতে হবে।
এখন প্রয়োজন জাতিসঙ্ঘ ও ওমানের সহায়তায় সমান্তরাল দু’টি প্রক্রিয়া : আঞ্চলিক পক্ষগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সমঝোতা এবং ইয়েমেনিদের মধ্যে অন্তর্র্ভুুক্তিমূলক রাজনৈতিক আলোচনা। প্রথম ধাপে হামলা বন্ধ, মানবিক প্রবেশাধিকার, আটক সাহায্যকর্মীদের মুক্তি ও বেসামরিক অবকাঠামো সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পরবর্তী ধাপে ক্ষমতা ভাগাভাগি, বিকেন্দ্রীকরণ, রাজস্ব বণ্টন এবং নিরাপত্তা খাত পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। সৌদি আরবের জন্য আপস মর্যাদাহানি নয়; হাউছিদের জন্যও সামরিক সক্ষমতা অনির্দিষ্ট যুদ্ধের যুক্তি হতে পারে না। দায়িত্বশীলতার পরিচয় হবে নিরাপত্তা ও জনগণের অধিকার নিশ্চিত করে গ্রহণযোগ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
hrmrokan@hotmail.com
Feature মতামত












