দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা এবং ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান প্রতিরোধে সরকার ও বিরোধী দলসহ সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলেছেন, শেখ হাসিনার বিদায়ই দেশের সব সমস্যার সমাধান নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ভাসানী জনশক্তি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি : সমাধান কোন পথে?’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আরো পড়ুন—মন্দিরে নারীদেরকে পুরোহিতদের ধর্ষণ বিষয়ে যা বললেন নেহা বোরা
সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ভাসানী জনশক্তি পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী। প্রধান অতিথি ছিলেন সংসদ সদস্য শাহ্ ওয়ারেস আলী মামুন। প্রধান বক্তা ছিলেন দলের মহাসচিব ড. আবু ইউসুফ সেলিম। সঞ্চালনা করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রিন্সিপাল মো: হারুনুর রশিদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে শাহ্ ওয়ারেস আলী মামুন বলেন, সভায় উপস্থিত সবাই ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নির্যাতিত মানুষ। জুলাইয়ের চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার মধ্য দিয়েই দেশ এগিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী জুলাইয়ের চেতনা শতভাগ ধারণ করেন। তবে শেখ হাসিনার বিদায়ই সব সমস্যার সমাধান নয়। বৈদেশিক শক্তি এখনো বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের লুটপাট ও ক্ষয়ক্ষতির পর দেশকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায় বলে মন্তব্য করেন তিনি। একইসাথে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসব ষড়যন্ত্র কোনো সরকারের বিরুদ্ধে নয়, দেশের বিরুদ্ধে। তাই জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব রাখা যাবে না।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে ড. আবু ইউসুফ সেলিম বলেন, ‘আমরা পিন্ডির গোলামির জিঞ্জির ছিন্ন করেছি দিল্লির দাসত্ব করার জন্য নয়।’ ভারতের দালাল ও ‘র’-এর এজেন্টরা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে ফ্যাসিবাদ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরো পড়ুন—পারমাণবিক হামলার শঙ্কা : নাগরিকদের যেসব সতর্কতা অবলম্বন করতে বলল ইরান
দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন ছিল জাতীয় স্বার্থ, স্বাধীনতা ও শোষিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দর্শন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব এবং মওলানা ভাসানীর উদার মানসিকতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের একমাত্র পথ জাতীয় ঐক্য। বর্তমানে সরকারি ও বিরোধী দলে থাকা অনেকেই অতীতে মজলুম ছিলেন। তাদের লংমার্চ কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলন নয়; বরং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে এ কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী সব সময় দেশের স্বার্থে ও জাতীয় ঐক্যের পক্ষে কাজ করেছেন। তার নেতৃত্বে ফারাক্কা লংমার্চ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।
আজাদ পার্টির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান বলেন, আমাদের প্রধান শত্রু ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের আগস্টের পর আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশই আমার সবচেয়ে প্রিয় দেশ। তবে দেশের সব মানুষকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না কেন, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। আদালত ও পুলিশসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের অনেক কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে।
গণঅধিকার পরিষদের সহসভাপতি ও মুখপাত্র মো: ফারুক হাসান বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের সাথে থাকা সবাই জুলাইপন্থী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী। ফ্যাসিবাদ ফিরে এলে কারও পিঠের চামড়া থাকবে না। মওলানা ভাসানীকে নির্লোভ মানুষ উল্লেখ করে তিনি তার আদর্শ ও রাজনৈতিক অবদান থেকে শিক্ষা নেয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বাবুল সরদার চাখারি বলেন, এখন বিএনপির আশপাশে যারা আছেন, তাদের অনেকেই তখন রাজনীতির মাঠে ছিলেন না। মাঠে ছিল ভাসানী জনশক্তি পার্টি। ইতিহাস থেকে মওলানা ভাসানীকে মুছে ফেলা যাবে না।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী বলেন, মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কঠিন লৌহঐক্য গড়ে তুলতে হবে। পতিত স্বৈরাচারকে আর কখনো ফিরে আসতে দেয়া হবে না। জাতীয় স্বার্থে সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় আরো বক্তব্য দেন জুলাই মঞ্চের সদস্য সচিব সাকিব হাসান, ভাসানী জনশক্তি পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোশাররফ হোসেন, প্রিন্সিপাল তাসলিমা নাজনীন, মো: আরিফুল ইসলাম, মো: মকবুল হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার আলী আহসান, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক রতন দেওয়ান, ভাসানী নারী শক্তি পার্টির আহ্বায়ক সোনিয়া আকতার, বংশাল থানা সভাপতি ইমরুল হাসান ওয়াসিম প্রমুখ।
বক্তারা মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শন, ফারাক্কা লংমার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, জুলাইয়ের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসাথে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে দল-মতনির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।












