বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। এতে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

লিখিত বক্তব্যে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ছাত্রশিবির। সংগঠনটির অভিযোগ, গণভোটে ৬৯ শতাংশ মানুষের রায় ও জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। পিএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।

পিএসসির স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে গত ১৮ আগস্ট পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘চায়ের আমন্ত্রণের’ পর পিএসসির আরও দুই সদস্য ড. মো. মহিউদ্দিন ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রহমান আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করেন। ছাত্রশিবিরের ভাষ্য, এসব ঘটনা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।

এ ছাড়া পিএসসির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখায় সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর পদে প্রশাসন ক্যাডার থেকে চুক্তিভিত্তিক দলীয় লোক নিয়োগের অভিযোগ করে সংগঠনটি। তাদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম জালিয়াতির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও ১ হাজার ২০০-এর বেশি প্রার্থী নিয়োগ পাননি বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, রাজনৈতিক যাচাই-বাছাই ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে চাকরিপ্রার্থীদের পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ভিন্নমতের সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে কারও কারও নিয়োগ আটকে দেওয়া হচ্ছে।

মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পুনরায় ১০০ থেকে বাড়িয়ে ২০০ করার উদ্যোগ এবং সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর সর্বোচ্চ ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবেরও প্রতিবাদ জানায় সংগঠনটি। একই সঙ্গে পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে কোনো কারণ না দেখিয়ে ৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে ৫৬ জন চূড়ান্ত মেধাবীকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ তোলে তারা।

পিএসসি সংস্কারে ১২ দফা প্রস্তাব

সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ১২ দফা প্রস্তাব তুলে ধরে ছাত্রশিবির।

পিএসসি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংগঠনটির প্রস্তাবগুলো হলো—

১. জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসির কাঠামো পুনর্গঠন করে তিনটি পৃথক কমিশন গঠন এবং চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে সংসদ ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্বচ্ছ বাছাই কমিটি করা।

২. নবম ও দশম গ্রেডসহ সরকারি সব চাকরির নিয়োগ পিএসসির অধীনে আনা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া ও ফলাফল প্রকাশে মন্ত্রণালয় বা অন্য কোনো মহলের অনানুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে কমিশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।

৩. কোডভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন, ‘কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ’ (সিবিআই), প্রশ্নফাঁস রোধে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস ও ওএমআর ট্র্যাকিং এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি বহাল রাখা।

৪. মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলোর কাছ থেকে নির্ধারিত সময়ে জনবলের চাহিদা নিয়ে সমন্বিত বার্ষিক নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা।

৫. বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা এবং প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশ করা।

৬. রাজনৈতিক পরিচয়, পারিবারিক সংশ্লিষ্টতা বা কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে প্রার্থীর সঙ্গে বৈষম্য না করা। সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত না হলে কাউকে নিয়োগ থেকে বাদ না দেওয়া।

পুলিশ ভেরিফিকেশন ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সংগঠনটির প্রস্তাব—

৭. সাধারণ সরকারি নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে শেষ করা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য, যাচাইয়ের মানদণ্ড ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের পরিচয় লিখিতভাবে প্রকাশ করা।

৮. জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ও প্রাসঙ্গিক অপরাধসংক্রান্ত সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা।

৯. ভেরিফিকেশনে কোনো নেতিবাচক তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে লিখিতভাবে কারণ জানানো এবং আপিল বা পুনর্বিবেচনার কার্যকর ব্যবস্থা রাখা।

১০. মৌখিক পরীক্ষার জন্য অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো ও নির্ধারিত মানদণ্ড প্রণয়ন এবং পরীক্ষকদের মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।

১১. ভাইভা পরীক্ষার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করা, যাতে মূল্যায়নে অসংগতি খতিয়ে দেখা এবং সংক্ষুব্ধ প্রার্থীর আপিলের সুযোগ থাকে।

১২. প্রশ্নফাঁস ও প্রক্সি পরীক্ষা ঠেকাতে নিরাপদ প্রযুক্তি, ডিজিটাল নজরদারি এবং পিএসসির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষ জনবল নিয়োগ করা।

সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত কর্মীদের পুরস্কৃত করার জায়গা নয়; এটি রাষ্ট্রের সেবা করার দায়িত্ব। নিয়োগের ভিত্তি হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততা।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সংগঠনটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী যেকোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

এস