ইবরাহীম খলিল, ঠাকুরগাঁও থেকে

ঠাকুরগাঁওয়ের পর্যটনের অপার সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার হরিণমারী গ্রামের এক শতবর্ষী আমগাছ। সূর্যপূরীজাতের এই গাছকে ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই স্থানীয় কিংবা জেলার বাইরের মানুষের। স্থানীয়রা জানান, দুইশত বছরের বেশি সময় ধরে দুই বিঘার বেশি জায়গায়জুড়ে ডাল পালা বিস্তৃত করে রেখেছে সূর্যপুরি জাতের এই গাছ। গাছটি ৮০ থেকে ৯০ ফুট উঁচু। চারদিকে ২০টি মোটা ডাল ছড়িয়ে গেছে। প্রতিবছর লক্ষাধিক টাকার আমের ফলন হয় এই গাছ থেকে। গাছের প্রতি মানুষের আগ্রহের কারণে এ্ই গাছের আমের দামও বেশি রাখা হয়। দূর থেকে দেখলে গাছের প্রতিটি ডাল একেকটি আস্ত গাছ বলে মনে হয়। তবে গাছটি কে কবে লাগিয়ে ছিল তার সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারছে না। এতো সময় ধরে বেঁচে থাকা এবং বড় বড় ডালপালার বিস্তৃতিকে অলৌকিক মনে করে মানুষ।

দুই শতাধিক বছর ধরে কালের সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটিকে দেখতে বিকেল হলেই শত শত মানুষের ঢল নামে। এমনকি গাছটি দেখার জন্য আমেরিকা থেকে শুরু করে নেপাল ভুটানের মানুষও চলে আসেন মাঝে-মধ্যেই। একেবারেই প্রত্যন্ত এবং সীমান্তবর্তী উপজেলা বালিয়াডাঙ্গী। জেলা সদর থেকে অন্তত ৫০ কিলোমিটার রাস্তা পার হয়ে এই গাছ দেখতে প্রতিদিন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ ভিড় করেন। এই গাছকে কেন্দ্র করে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকায় অবকাঠামো উন্নয়নসহ প্রচার প্রচারণা এবং সরকারীভাবে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

অবাক করা বিষয় হলো পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকায় গাছের উপযুক্ত পরিচর্যা এবং সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রশাসনিক কোন উদ্যোগ নেই। স্থানীয়রা জানান, হাবিলদার মো. সাইদুর রহমান মোল্লা এবং মো. নুর ইসলাম নামের দুই ভাইয়ের জমিতে গাছটির অবস্থান। এতো বড় গাছ বাংলাদেশে কিংবা এশিয়া মহাদেশে নাই।

সরকারী উদ্যোগ না থাকায় দেখতে আসা মানুষের কাছ থেকে দুইভাই মিলে টাকা উত্তোলন করেন। এক সপ্তাহ করে সময় ভাগ করে একেকজন টাকা উত্তোলন করেন। এজন্য বাড়ির সামনে একটি দেওয়াল তুলে দিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট সিস্টেম চালু করে দিয়েছেন। এখন গাছ দেখতে হলে মালিককে জনপ্রতি ৬০ টাকা দিতে হয়।

মানুষের আগমণ বাড়তে থাকা এবং আশপাশে কোন বাজারঘাট না থাকায় চাহিদার কথা বিবেচনা করে গাছের পাশেই কয়েকটি স্থায়ী দোকান বসানো হয়েছে। বিকেল হলেই মানুষের আগমণ বাড়তে থাকে। প্রতিদিন তাদের বেচাবিক্রি ভাল হয় বলেই দোকান মালিকরা। তবে প্রচার বেশি হলে আরও বেশি মানুষ এখানে আসতো বলে মনে করেন দোকানের মালিকরা।

গাছের মালিকদের একজন হাবিলদার মো.সাইদুর রহমান এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, তিনি নিজে পুলিশে চাকুরী করেন। গাছটির মালিক তারা দুইভাই। মানুষের আগ্রহের জায়গাতে রয়েছে তাদের এই গাছ। তাই তারা কিছু টাকা উত্তোলনের ব্যবস্তা করেছেন।

স্থানীয় সাংবাদিক নূর হোসেন জানান, এই গাছ পুরো ঠাকুরগাঁওয়ের পর্যটনের অপার সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে। সরকারী উদ্যোগ না থাকায় পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। রাজস্ব থেকে বঞ্চিত সরকার। প্রশাসনিক অবহেলার কারণে তা যথাযথ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিশেষ করে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন আর প্রচার, প্রচারণা বাড়ানো গেলে এই গাছ রাজস্ব অর্জনের মাধ্যম হতে পারে।

ঠাকুরগাঁওয়ের মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিক মামুন আলাপকালে জানান, পুরো ঠাকুরগাঁওজুড়েই পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনিক উদ্যোগ না থাকার কারণে এই জেলা পিছিয়ে আছে। এখন জেলাজুড়ে ঘুরলে দেখতে পাবেন দিগন্তজুড়ে চোখ ধাধানো সবুজ ধানক্ষেত, চা বাগান, সুন্দর আবহাওয়া, সজিব বাতাস। সতেজ খাবার। নেই খরা কিংবা বন্যা। প্রাকৃতি দুর্যোগ নেই বললেই চলে। সবকিছু মিলে ঠাকুরগাঁও জেলায় রয়েছে অপার সম্ভাবনা। কিন্তু এই জেলার মানুষকে গরিব জেলা বলে আখ্যায়িত করা হয়। এটা খুবই দু:খজনক। এখানকার উৎপাদিত ধান সারাদেশের খাদ্য চাহিদা মেটায়। সবুজ শাকসবজিও জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্য জেলায় যায়। ফল ফলাদিতেও উদ্বত্ত এখানে। বিশেষ করে আম-লিচু উৎপাদনেও প্রথম সারিতে ঠাকুরগাঁও। প্রতিনিয়ত নতুন ফসলের সম্ভাবন দেখা দিচ্ছে এই জেলাতে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে এই জেলাকে।

ঠাকুরগাঁওয়ের অপার সম্ভাবনাগুলোর মধ্যে পর্যটন একটি। পর্যটনকে কাজে লাগাতে পারলে এই জেলা কোনভাবেই পিছিয়ে থাকার নয় বলে মনে করেন জেলার সিনিয়র সাংবাদিক হারুন অর রশিদ।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অঞ্জন কুমার দাস এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, আমগাছটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এজন্য প্রশাসনের এবিষয়ে কিছু করার আছে কি-না আমার জানা নাই। এছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ প্রশাসন বিশেষ করে থানার ওসি দেখেন বলেও জানান তিনি।