রংপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ কৃষক লীগ নেতা কর্তৃক একটি অস্থায়ী মন্দির দখলে রাখার ঘটনায় দুর্গাপূজার  প্রতিমা বিসর্জন না হওয়ার ১৫ দিনের মাথায় আদালতের আদেশে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে একদল আইনজীবী। এসময় আবারো উভয়পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কি হয়।  

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নগরীর ঠিকাদারপাড়াও ওই অস্থায়ী দুগামন্দিরে এ ঘটনা ঘটে। 

রংপুর জেলা জজ আদালতের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মন্দিরটি পরিদর্শনে আসেন জেলা জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সন্তোষ কুমার সরকারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল। তারা ঘটনাস্থলে এসে ব্যাক্তিমালিকানাধীন ওই অস্থায়ী মন্দিরটিতে থাকা দুর্গা প্রতিমা, কালি, সরস্বতীসহ অন্যান্য প্রতিমা পরিদর্শন করেন এবং তথ্য-উপাত্ত লিখতে থাকেন।  

পরিদর্শনের এক পর্যায়ে জমির মালিক দাবিদার রীতা রানী দাস পরিদর্শন টিমের কাছে অভিযোগ করেন অস্থায়ী মন্দির কমিটির সভাপতি জেলা কৃষক লীগ সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নুর ছোট ভাই কমল গোস্বামী বহিরাগত লোক ভাড়া করে এনে মন্দির প্রাঙ্গণে ভীতির সঞ্চার করেছেন। তার এই অভিযোগের পরই প্রান্নুর ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত বিষু সরকার রীতা রানীর ভাগ্নি অনিতা রানীকে ধাক্কা মারেন এবং ভারতে পাঠিয়ে দেয়ার হুমকি দেন। এসময় সেখানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। শুরু হয় কথা কাটাকাটি, বচসা, হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কি। পরে সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কমল গোস্বামীসহ বহিরাগত লোকজন সেখান থেকে সড়ে যান। 

পরিদর্শক দলের প্রধান অ্যাডভোকেট সন্তোষ কুমার সরকার জানান, ‘আমরা মাননীয় আদালতের আদেশে তিনজন এসেছি এটা পরিদর্শন করার জন্য। আমরা পরিদর্শন করলাম। আমাদের মতামত আমরা জানাবো আরকি। কোর্ট নিযুক্ত করেছে আমাদের। কোর্ট বলেছে দেখার জন্য, পরিদর্শন করার জন্য। পরিদর্শন করে আমাদের মতামত দেয়ার জন্য। আমরা যেটা দেখছি সেটা আমরা পরিদর্শনে লিখব। এখানে আমরা দুর্গামূর্তি দেখলাম, তারপরে কালিমূর্তি দেখলাম, যা যে অবস্থায় আছে সেটা দেখলাম, সেটাই আমরা লিখব।’

ঘটনার বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জমির মালিক দাবিদার রীতা রানীর ভাগ্নি অনিতা রানী দাস। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারকে রহমানকে বলতে চাই, আইনজীবীরা এসেছেন মন্দিরের মূর্তি নতুন না পুরাতন নির্ধারণ করার জন্য পাঠিয়েছে। কিন্তু কার জায়গায় এরা মূর্তি রেখে পূজা করতেছে, আসলে জায়গার মালিক কে, বা এটা মন্দির কিনা? যদি মন্দির হয়ে থাকে তো মন্দিরের নামে পেপারস আছে কিনা। সেটা তো তারা দেখতেছে না।‘

অনিতা রানী আরো বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, কৃষক লীগের সভাপতি প্রান্নু গোস্বামী উনার ক্ষমতা থাকা থেকেই,  যখন ফ্যাসিবাদী সরকার ছিল, তখন থেকে তার নজর পড়ে আমাদের এই জায়গার ওপরে। তখন থেকে এই জায়গাকে মন্দির নামে ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্মকে ইস্যু করে তারা আমাদের গরিব মানুষের জায়গাটা দখল করে রেখেছে।’

অনিরা রানী আরো বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমরা আরো জানাতে চাই, মূলত এই জায়গা এটা ছিল মোটর গ্যারেজ। আমাদের গ্যারেজটা বন্ধ করে দিয়েছে সে। আমাদের বাড়িতে সবাই মহিলা মানুষ, পুরুষ মানুষ নাই। আমাদের ক্ষমতা কম। সবদিক দিয়ে বল কম। প্রান্নুর প্রচুর টাকা। সে এই টাকা দিয়ে ছেলেপোলে ভাড়া করে নিয়ে এসে আমাদের জমি দখলে নেয়ার চেষ্টা করছে। এই এলাকায় শুধু চারটা হিন্দু পরিবার আছে। কিন্তু প্রান্নু আর তার ভাই কমল বাইরের এলাকার ছেলেপেলে, সব ভাড়াটিয়া গুন্ডাপাণ্ডা নিয়ে এসে আমাদের উপরে সব সময় হুমকি-ধামকি নির্যাতন করছে।’ 

জমির মালিক রীতা রানী বলেন, ‘আমার স্বামীর একটা গ্যারেজ ছিল এখানে। আমরা দীর্ঘদিন গ্যারেজ বন্ধ করে দুর্গাপূজা করে আবার বিসর্জন দিয়ে গ্যারেজ করি। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে প্রান্নু গোস্বামী সেটা দখল করার চেষ্টা করছে। আমার স্বামী বায়না করে নাই। প্রান্নু আমার স্বামীকে ২৬ দফায় ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সেই টাকা সে সাদা কাগজে সই নয়ে নিজের নামে মিথ্যা বায়না দেখাচ্ছে। সেটারও মেয়াদ বহুদিন আগে শেষ হয়েছে। এখন সে মন্দিরের নামে আমার জমি দখল করার চেষ্টা করছে। আমার এই জায়গার দাম কোটি টাকার ওপরে। এই জমি সে দখল করলে আমরা কোথায় গিয়ে বসবাস করবো। সে আমাদের ইন্ডিয়া পাঠানোর হুমিকি দিচ্ছে। প্রশাসন নিরব ভূমিকা পালন করছে।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রান্নু গোস্বামীর ছোট ভাই অস্থায়ী মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক দাবিদার কমল গোস্বামী বলেন, ‘পরিদর্শন টিমের কাছে আমরা আমাদের কালি, সরস্বতীসহ অন্যান্য প্রতিমাগুলো দেখিয়েছি যে, সেগুলো পুরোনো নাকি নতুন। আমরা বহিরাগত আনিনি। তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাদের ওপর মিথ্যা ব্লেম দিচ্ছে।’ 

এ বিষয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত রংপুর মেটোপলিট কোতয়ালী থানার ওসি (তদন্ত) মিলন চন্দ্র ভট্টাচার্য বলেন, ‘পরিদর্শনের সময় দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছি। তাৎক্ষণিকভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এব্যাপারে এখনো কেউ আইনগত ব্যবস্থা নিতে থানায় কোনো আবেদন করেনি।’

গত ২১ অক্টোবর জেলা কৃষক লীগ সভাপতি প্রাণকৃষ্ণ গোস্বামী প্রান্নু ও তার ভাই কমল গোস্বামীর নেতৃত্বে অস্থায়ী দুর্গামন্দিরটিতে কালিমূর্তি স্থাপন করে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে জমির মালিক রীতা রানী তাতে বাধা দিলে দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, বিক্ষোভ ও সড়ক অবেরোধের ঘটনায় দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন বন্ধ হয়ে যায়। এনিয়ে ডিসি অফিসে বৈঠক হলেও কোনো সুরাহা হয়নি। ফলে ১৫ দিনেও মন্দির থেকে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন হয়নি। এ নিয়ে ওই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় সেখানে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।