ইবরাহীম খলিল, ঠাকুরগাঁও থেকে ফিরে
কোনো পাহাড়ি ঢাল নয়, যতদূর চোখ যায় শুধু সমতল জমি। সেই জমিতেই সারি সারি চা গাছ। সীমান্তঘেঁষা জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর নিটাল ডোবা গ্রামে এখন এমন দৃশ্যই চোখে পড়ে। সবুজ পাতার এই চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছে। নাগর নদ অববাহিকায় গড়ে ওঠা এ অঞ্চলে এখন বাণিজ্যিকভাবে গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি উৎপাদন হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, উৎপাদিত চা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। এই চা বিদেশে রফতানি করে ডলার উপার্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এই অঞ্চলের বিপরীতে ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের ইসলামপুর মহকুমার কোদালদহ-ছোটা খানতি এলাকাজুড়ে রয়েছে চা-বাগান। সীমান্তের এ পাশেও সমতল ভূমিতে চা চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অর্গানিক পদ্ধতিতে চা চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে বাগানের পরিধি ও উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ছে।
চা চাষিরা জানান, কয়েক বছরের মধ্যেই চা চাষ বদলে দিয়েছে এলাকার অর্থনীতির চিত্র। একসময় যে পতিত জমি গোচারণের কাজে ব্যবহৃত হতো, এখন সেই জমিই চায়ের সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে। এসব বাগানে অন্তত তিন হাজারের বেশি নারী-পুরুষ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। চা-বাগানে কাজ করা মুন্নীহার জানান, আগে আমন ধান রোপণের পর তাঁদের বেকার থাকতে হতো। অভাবে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়েছে। এখন চা-বাগানে সারা বছর কাজের সুযোগ পাওয়ায় সেই কষ্ট অনেকটাই কমেছে। এখানকার আয় দিয়েই তাঁর সংসার চলছে।
ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার উত্তরের সীমানা ঘেঁষে বয়ে গেছে নাগর নদ। এই নদের তীরে গড়ে উঠেছে চায়ের বাগান। অনেকটা সমতল এলাকাতে চায়ের বাগানে স্থানীয় মানুষের মুখে হাসির ঝিলিক। চায়ের ভাল উৎপাদন আর কর্মসংস্থানের কারণে সবার মুখে হাসিমাখা কথা। এরমধ্যে চা বাগানের আশপাশে সময় কাটানোর জন্য আবার পর্যটকদেরও ঢল নামে। এর বাইরের অর্ন্তনীহিত বিষয় হলো এই জেলায় চা বাগানের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়ায় রফতানির করে ডলার আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে মনে করা হতো সমতলভূমিতে চায়ের চাষ মানে কেবল পঞ্চগড় জেলাকে। এখন এর সাথে যোগ হয়েছে পাশের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের মাটিও। এই নাগরনদের পাশাপাশি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বিস্তৃত জায়গাজুড়ে চা বাগান চোখে পরে। এই উপজেলার চা বাগানের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে একটি চা ফ্যাক্টরি। এই চায়ের ফ্যাক্টরিতে সারাবছর দুই শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
৩০ অক্টোবর শুক্রবার মেঘলা আকাশ মাথায় নিয়ে যাই ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার শেষ প্রান্তে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা নাগরনদের তীরে চায়ের বাগান দেখার জন্য যাই। নদীর পাশঘেঁষে বাগানের পাশে পতিত জমিতে দাঁড়িয়ে সীমান্ত পাহারা দিচ্ছিলেন বিজিবির এক সদস্য। তার সাথে কথা হয় নানা বিষয় নিয়ে। তিনি তিন মাসের মতো এই এলাকাতে বাংলাদেশের সীমানা পাহারা দেন। বিজিবি সদস্য জানালেন, নাগর নদকে কেন্দ্র করে এখানে কিছুটা ঢালু জমিতে চা বাগান করা হয়েছে। এখানকার বাগানগুলোর চা বেশ মান সম্মত। ফলনও ভালো। এখানকার মালিকরা লাভবান। সেইসাথে কর্মসংস্থানও হয়েছে এলাকার মানুষের। আমার জানা মতে মালিকের কাছ থেকে লিজ নিয়ে যারা চা বাগান পরিচালনা করছেন তারা বছরে কোটি কোটি টাকা লাভ করছেন।
চা বাগান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক নূর হোসেন জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে চায়ের সম্ভাবন অনেক। চায়ের ফ্যাক্টরি গড়ে উঠাতে ব্যক্তি পর্যায়ে এখানে চায়ের আবাদ বেড়েছে। এবং চায়ের চাষ এখানে বেশ লাভজনক। বিশেষ করে রফতানিযোগ্য এই পণ্যটির চাষ বাড়লে দেশ লাভবান। কারণ চা থেকে ডলার আসে। এর অর্থ হলো চায়ের উৎপাদন বাড়লো মানেই ডলারের হাতছানি।
জেলার আরেক সিনিয়র সাংবাদিক হারুন- অর রশিদ বলেন, চা বাগান দেখতে এখন অনেক পর্যটকরা আসেন। বিশেষ করে সমতলে চা বাগান বিস্তৃত হচ্ছে এই জেলায়। এটা দেখার জন্যও মানুষ আসে। সব কিছু মিলে চায়ের বাগান এই জেলাতেও সম্ভাবনার ফসলে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে চায়ের বাগানতো একবার ফল দিয়ে শেষ না। একবার বাগান গড়ে তুললে ৪৫ দিন পর পর চায়ের উপযোগী পাতা পাওয়া যায়। তাতে উপার্জনের স্থায়ীত্ব বেড়ে যায়। এই সংবাদকর্মীর কথার সাথে মিল পাওয়া গেল সরেজমিনে ঘুরে। বালিয়াডাঙ্গীর মূল সড়ক থেকে একটু ভেতরে গেলে চারদিকে দিগন্তজুড়ে ধানক্ষেতের সমারোহ। এর মধ্যেই মাঝমধ্যে চোখে পড়ছে চায়ের বাগান। এসব বাগানে চায়ের নতুন কুঁড়ি চোখকে দোলা দেয়। তার মানে হলো এই জেলার ধানি জমিতেও চায়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। একসময় যে জমিতে আগাছা ছাড়া কোনো ফসল হতো না সেই জমিতে এখন চা গাছের সমারোহ। নদীর ধারে যেসব জমি শুধু গো-চারণ ভূমি হিসেবে পড়ে থাকত, সেই দিগন্তবিস্তৃৃত জমিও চা চাষে সবুজের লীলাভূমিতে ভরপুর হয়ে উঠেছে।
জেলার কৃষি অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ২০০৭ সালে ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় প্রথম চা চাষ শুরু হয়। এখন ঠাকুরগাঁও জেলার প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে চা চাষ হচ্ছে। জেলায় ৬০০ হেক্টর জমিতে চায়ের আবাদ হচ্ছে। বালিয়াডাঙ্গীতে সম্পূর্ণ অর্গানিক পদ্ধতিতে চা চাষ করা হয়। সমতল ভূমিতে এ ধরনের চাষ কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় ছোট-বড় মিলে শতাধিক চা বাগান রয়েছে। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় দুই শ’ মতো চায়ের বাগান গড়ে উঠেছে।
কৃষিবিদ মো. আবু হোসেন বলেন, ঠাকুরগাঁও জেলার ভৌগোলিক ও ভূমি অবস্থান ভালো। এখানকার মাটি যেমন অন্যান্য ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী তেমনি চায়ের জন্যও খুব উপযোগী। তবে যে জমি বেশি উর্বর ও অন্যান্য ফসল ভালো ফলে, সেই জমি বাদ দিয়ে নদী অববাহিকার জমিতে চা চাষ করা হলে কৃষকরা আরো বেশি লাভবান হবেন।
স্থানীয় সাংবাদিক নূর হোসেন বলেন, শুধু কর্মসংস্থান নয়; বাগান ঘিরে বদলে যাচ্ছে এই এলাকার পর্যটন চিত্রও। সবুজে ঘেরা চা-বাগানের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা।
এদিকে চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে প্রতি বছর দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১০ কোটি কেঁিজর বেশি। এখান থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রফতানি করা হয়। তাতে ডলার আয় হয়। দিন যত গড়াচ্ছে বিদেশে এর চাহিদা বাড়ছে। এর সাথে ঠাকুরগাঁওয়ে উৎপাদিত চা রফতানিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে।












