পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে কী জরুরি ব্যবস্থা নেয়া দরকার সে বিষয়ে নির্দেশ জারি করেছে ইরান। সোমবার রাতে ইরানের কেশম দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এরপর তড়িঘড়ি জারি করা হয়েছে এই নির্দেশাবলী।

এর আগে ইরানের মাউন্ট কোলাং পর্বতমালাসহ একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি মার্কিন গণমাধ্যমে এই খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানে আবার হামলা চালানোর জন্য চাপ দিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য মঙ্গলবারই ইরানের উপর হামলা চালানোর কথা নিশ্চিত করেছেন। টেলিফোন মারফত ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি। এর আগে হরমুজ প্রণালীর কেশম দ্বীপকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানোর খবর পাওয়া গিয়েছিল।

আরো পড়ুন—আরো নড়বড়ে কাশ্মির সরকার, ওমর আব্দুল্লাহকে ‘অপদার্থ’ বলে কেন দল ছাড়লেন রুহুল্লাহ?

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান একটা অ্যান্টি এয়ারক্রাফ্ট সিস্টেম তৈরি করেছিল এবং শেষ হওয়ার সাথে সাথে সেটাকে নিশানা করে আমরা গত রাতে সফলভাবে আঘাত হেনেছি।

তিনি এই অভিযানকে ‘লিমিটেড অ্যাটাক’ বা সীমিত পরিসরের হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

প্রসঙ্গত, অ্যান্টি এয়ারক্রাফ্ট সিস্টেম বলতে আকাশপথে আক্রমণ রুখতে সক্ষম এক ধরনের প্রতিরক্ষারক্ষা ব্যবস্থাকে বোঝায়। অ্যান্টি এয়ারক্রাফ্ট সিস্টেম আকাশপথে ধেয়ে আসা হুমকিকে শনাক্ত, অনুসরণ এবং নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করতে পারে। এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় স্বতন্ত্রভাবে স্থল, নৌ বা আকাশ-ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে আবার এগুলোর সমন্বিত সংমিশ্রণও ব্যবহার করা যেতে পারে।

এদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আরেকটা যুদ্ধ হলে তা কোনো পক্ষের জন্যই ভাল হবে না। একটা সরকারি সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধ থেকে কেউ (দুই দেশকে ইঙ্গিত করে) লাভবান হবে না।’

তার কথায় আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ সমাধানের চেষ্টা চলছে।

অন্যদিকে, মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের হামলা থেকে নিজেদের সম্পদ রক্ষার করার জন্যই এই হামলা চালানো হয়েছিল। তারা জানিয়েছেন, এই অভিযান সীমিত পরিসরের ছিল এবং তা ইরানের বিরুদ্ধে আবার বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরুর ইঙ্গিত নয়।

ইরানের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেশমের নিকটবর্তী বন্দর-এ লেঙ্গেহ শহর থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো এ কথা জানিয়েছেন যে যুক্তরাষ্ট্র মাউন্ট কোলাংকে মার্কিন নিশানা করতে পারে। কারণ, এই জায়গার সাথে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য সোমবার বলেছিলেন এই ধরনের হামলাকে তিনি ‘কোনো বড় বিষয়’ বলে মনে করেন না এবং এই অভিযান ‘এক ঘণ্টার মধ্যে’ চালানো যেতে পারে।

এদিকে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপর ইরানকে লক্ষ্য করে পারমাণবিক হামলা চালানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন বলে মার্কিন গণমাধ্যমে গুঞ্জন শোনা গেছে।

মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন দাবি করেছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য উস্কানি দিচ্ছেন এবং সেক্ষেত্রে এই হামলায় মাউন্ট কোলাংকে নিশানা করা হতে পারে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কার্লসন একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিলেন।

তবে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এই দাবির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

পারমাণবিক হামলার ক্ষেত্রে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে?
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি’ (আইআরএনএ) ইসফাহান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির উপ-পরিচালক ইব্রাহিম আদেলজাদেহর একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে যেখানে তিনি পারমাণবিক হামলার ঘটনায় কী ধরনের জরুরি ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন।

ওই সাক্ষাৎকারে ইব্রাহিম আদেলজাদেহ কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশাবলী মেনে চলার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, কোনো পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর যদি ভবনের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়, তাহলে দরজা ও জানালা বন্ধ রাখতে হবে এবং বাইরের বাতাস ভেতরে বয়ে আনে এমন যে কোনো বায়ুচলাচল ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে হবে।

আরো পড়ুন—ঢাবির ডিনের ছেলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ,

তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, যদি বেসমেন্টে বা ভবনের মাঝখানে এবং জানালা থেকে দূরে কোনো ঘর থেকে থাকে, তবে সেটা আশ্রয় নেয়ার জন্য একটা উপযুক্ত জায়গা হতে পারে।

বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটলে সরাসরি সেদিকে না তাকানোর পাশাপাশি সম্ভব হলে প্রাথমিক বিস্ফোরণের ধাক্কা না কেটে যাওয়া পর্যন্ত কোনো উপযুক্ত প্রতিবন্ধকের আড়ালে মাটির কাছাকাছি থাকার পরামর্শও দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যাতে তার প্রভাব ভবনের ভেতরে প্রবেশ না করতে পারে। তার জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।

ইব্রাহিম আদেলজাদেহর মতে, যারা তেজস্ক্রিয় কণার সংস্পর্শে এসেছেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা যেন মুখ স্পর্শ না করেন এবং সাবধানতা অবলম্বন করে নিজেদের পরনের বাহ্যিক পোশাক খুলে ফেলে একটা মুখবন্ধ করা ব্যাগে রাখেন। ওই পোশাক যাতে অন্যান্যদের সংস্পর্শে না আসে সে বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া দরকার।

তার কথায়, ‘একইভাবে হালকা উষ্ণ জল ও সাবান দিয়ে ত্বক ও চুল ধুয়ে ফেললেও তেজস্ক্রিয় বিকিরণের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে।’

পাশাপাশি তিনি নাজিয়েছেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটলে ভবনের ভেতরে থাকা উচিত।

তবে, যদি অন্যত্র যাওয়া নিতান্তই প্রয়োজন বলে মনে করা হয়, তাহলে ত্রাণ সংস্থাগুলোর দেয়া নির্দেশ ও নির্ধারিত রুট অনুসরণ করা দরকার।’

তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণস্থল থেকে দূরে বসবাসকারী ব্যক্তিদেরও সরকারের জারি করা সতর্কবার্তা গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত।’

ইব্রাহিম আদেলজাদেহ বলেন, যদি জায়গা খালি করে অন্যত্র যাওয়ার আদেশ জারি করা হয় তাহলে কর্তৃপক্ষের ঘোষিত রুট বেছে নেয়া উচিত। যদি আপনি গাড়িতে সফর করেন তবে জানালা এবং এয়ারভেন্ট (যে অংশ দিয়ে বায়ু চলাচল করে) বন্ধ রাখতে হবে।

এই কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে বায়ু চলাছলের জন্য ইন্টারনাল সার্কুলেশন বা অভ্যন্তরীণ সঞ্চালনের ব্যবস্থা রাখলে বাইরে থেকে আসা বাতাসের প্রবাহ কমানো যেতে পারে।

একইভাবে ধুলো উড়লে এক টুকরো কাপড় বা জামাকাপড় দিয়ে মুখ ও নাক ঢেকে রাখলে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে তেজস্ক্রিয় কণা প্রবেশের সম্ভাবনা কমে যায়।

এ ছাড়াও, ইসফাহান প্রাক-হাসপাতাল জরুরি বিভাগের জনসংযোগ বিভাগ শিক্ষামূলক ভিডিওও প্রকাশ করেছে। সেখানে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থের প্রভাব এড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

ওই হাসপাতালের জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা আব্বাস আবিদি জানিয়েছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়া, যেমন আয়োডিন ট্যাবলেট সেবন ইত্যাদি এড়িয়ে চলা দরকার। তা ছাড়া নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নিতে হবে, তেজস্ক্রিয় কণার সংস্পর্শে এলে তার প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা নেয়া এবং সরকারি সূত্র থেকে জারি হওয়া নির্দেশ মেনে চলা দরকার।

কিছু ক্ষেত্রে আয়োডিন থাইরয়েড গ্রন্থি তেজস্ক্রিয় আয়োডিন শোষণ করলে আয়োডিন ট্যাবলেট তার প্রভাব হ্রাস করতে পারে, তবে এটা অন্যান্য তেজস্ক্রিয় পদার্থ বা বিস্ফোরক বিকিরণ থেকে রক্ষা করে না।

আব্বাস আবিদির কথায়, অতএব, এই ওষুধ কেবল তখনই সেবন করা উচিত যদি তা স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্তৃপক্ষের দ্বারা সুপারিশ করা হয় এবং তা অবশ্যই ব্যক্তির বয়স, স্বাস্থ্য এবং সংক্রমণের প্রকৃতি বিবেচনা করে তবেই ব্যবহার করা উচিত।

‘আগাম সতর্কতা হিসাবে বা পারমাণবিক দুর্ঘটনার সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে আয়োডিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় নয়।’

ইসফাহান প্রাক-হাসপাতাল জরুরি বিভাগের জনসংযোগ বিভাগের তরফে জারি করা ওই ভিডিওতে ‘প্রুশিয়ান ব্লু’ নামে একটা ওষুধের ব্যবহার নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

আবিদি বলেন, ‘তেজস্ক্রিয় সিসিয়ামের (ক্ষার যুক্ত ধাতু সিজিয়ামের একটা তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ) ক্ষেত্রে কিছু সময় এই ওষুধ রোগ নির্ণয় করতে সাহায্য করে এবং চিকিৎসক এটা সেবনের পরামর্শও দিতে পারেন।’ তবে তা ‘আয়োডিন পিলের বিকল্প নয়’ বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

সূত্র : বিবিসি