ইরান যুদ্ধের আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। লড়াইয়ের ধাক্কায় ইউরোপের জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে ১০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি। মধ্যপ্রাচ্যের মিত্ররাও পড়েছে বিপদে, বেড়েছে নিরাপত্তাঝুঁকি। যুদ্ধের খরচের বোঝা এখন শুধু ওয়াশিংটনকে নয়, আটলান্টিকের দুই পারের দেশ ও সাধারণ মানুষকেও বইতে হচ্ছে।
মিডলইস্ট মনিটর (৪ নভেম্বর) জানায়, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস গত শুক্রবার বলেছেন, গত আট মাসে শুধু জ্বালানির দাম বেড়ে ইউরোপের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ১০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি। এই হিসাব ইরানের যুদ্ধের চেয়েও বেশি প্রশ্ন তুলেছে ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্ত নিয়ে। যুদ্ধের আর্থিক বোঝা যে আর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, এটাই তার স্পষ্ট প্রমাণ।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সরাসরি যুদ্ধব্যয় অক্টোবরের মাঝামাঝি ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। কংগ্রেসে পাঠানো মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের (সেন্টকম) এক অশ্রেণিবদ্ধ হিসাব থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এর প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার নতুন সামরিক সক্ষমতা তৈরিতে নয়, বরং যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা ও ধ্বংস হওয়া সরঞ্জাম আবার কিনতে ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ নিরাপত্তা বাড়ানোর চেয়ে যুদ্ধের কারণে হারানো সম্পদ পূরণেই বেশি অর্থ যাচ্ছে।
তবে এই হিসাবেও পুরো ক্ষয়-ক্ষতির চিত্র নেই। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা পুনর্নির্মাণের ব্যয় এতে ধরা হয়নি। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে ২৪টি স্থানে ২৭৪টি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো মেরামতে ব্যয় হতে পারে ৫ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার। আগস্ট পর্যন্ত ২৬টি সামরিক ঘাঁটির স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে ১১৫টির বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে রয়েছে রাডার, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, বিমান রাখার হ্যাঙ্গার ও জ্বালানি ডিপো।
যুদ্ধের অস্ত্রভান্ডার আবার পূরণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে প্যাট্রিয়ট ও থাড প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। সেগুলো তৈরি ও সরবরাহে সময় লাগে। মার্কিন কংগ্রেসের বাজেট দফতরের হিসাবে, যুদ্ধের তীব্রতা সীমিত থাকলে প্রতি মাসে ব্যয় প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার। জুলাইয়ের মতো তীব্রতা ফিরে এলে তা বেড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।
যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি হলো, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের আশ্বস্ত করা জরুরি ছিল। উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হামলা জ্বালানি সরবরাহের জন্য বাস্তব হুমকি তৈরি করেছিল—সমালোচকেরাও তা স্বীকার করেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা থাকলেই তা দক্ষতার সাথে পরিচালিত হয়েছে, এমন নয়।
যুদ্ধের পরিকল্পনাকারীরা ভেবেছিলেন, অভিযান হবে সংক্ষিপ্ত ও তীব্র। কিন্তু আট মাস পর পেন্টাগনের জুলাইয়ের হিসাবের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে ২৫ শতাংশের বেশি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আবার হামলা চালানোর প্রস্তুতিও নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ইউরোপের ক্ষোভও বাড়ছে। ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা ওয়াশিংটনকে অনিশ্চিত মিত্র বলে মন্তব্য করেছেন। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির একই হিসাব তুলে ধরে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, মিত্রদের সাথে আলোচনা না করেই যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করায় তার ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে ইউরোপকে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার ইরানে হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকাতে তারা কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাচ্ছে। এত দিন মার্কিন সেনাদের ঘাঁটি দেয়াকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা মনে করা হলেও আঞ্চলিক যুদ্ধের সময় সেটিই হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ পরিবারগুলোর ওপরও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। দেশটির আটটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে বিদ্যুৎ ও পেট্রলের খরচ বেড়েছে ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ। গড়ে প্রতি পরিবারকে মাসে অতিরিক্ত ৪২ থেকে ৬২ ডলার গুনতে হচ্ছে। শুধু পেট্রলের দামই বেড়েছে ১৯ থেকে ২৩ শতাংশ। জ্বালানি সরবরাহের পথে বিঘ্ন ও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এই চাপ বাড়িয়েছে। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও চাহিদা বৃদ্ধির মতো কারণও রয়েছে।
যুদ্ধের পরিণতি নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন চাপে পড়বে। নতুন করে যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত অর্থ চাইতে হলে আগে জানাতে হবে, এত দিনে কী অর্জন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটি, অস্ত্রের ঘাটতি এবং নতুন অস্ত্র তৈরিতে কত সময় লাগবে, তারও পূর্ণ হিসাব চাইবে কংগ্রেস। মিত্র দেশগুলো চাইবে, ভবিষ্যতে এমন বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তাদের সাথে আলোচনা করা হোক।
যুদ্ধের অনুমোদন না নিয়েই মিত্রদের ঝুঁকিতে ফেলা, ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব না দেয়া এবং যুদ্ধ শেষ করার রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট না রাখার পরিণতি দীর্ঘদিন বহন করতে হবে। ইউরোপের ১০০ বিলিয়ন ইউরো অতিরিক্ত ব্যয় এককালীন ক্ষতি নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও মিত্রদের মধ্যে অবিশ্বাসের দীর্ঘ সংকটের সূচনা।
ওয়াশিংটনের ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের হিসাবও চূড়ান্ত নয়, বরং সর্বনিম্ন হিসাব। যুদ্ধের পরবর্তী দফার নির্দেশ যখন আসবে, তখন এই বিপুল খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে গিয়ে পড়বে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।












