গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের সময় হামলার দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে সহকর্মী আন্দোলনকারীদের মারধরে গুরুতর আহত তৌফিক শেখের (২১) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। 

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। 

তৌফিক গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। তিনি ছয়ঘরিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের এসএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর পড়াশোনা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে গাজীপুরে আসেন তিনি। এক বন্ধুর মাধ্যমে লায়লা গার্মেন্টসে চাকরি নেন। গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তৌফিক।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, গত সোমবার বাংলাবাজার এলাকায় আন্দোলন চলাকালে মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন তিনি। এ সময় আন্দোলনকারীদের কয়েকজন তার ওপর চড়াও হয়ে মারধর করেন। এতে গুরুতর আহত হন তৌফিক। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

তৌফিকের বড় ভাই হারুন বলেন, ‘আমার ছোট ভাইয়ের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছি।’

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। ওই এলাকায়ও আন্দোলন চলছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক করেন। তবে পুলিশের অভিযানে তৌফিক আহত হননি। তাকে শ্রমিকেরাই মারধর করে আহত করেছেন।’

এদিকে আন্দোলন, সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ছবি-ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে গত কয়েক দিনে গাজীপুরে অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত কয়েক দিনে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত হয়েছেন বলে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ সংঘর্ষের ছবি ও ভিডিও ধারণের সময়, কেউ আবার ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন। সাংবাদিকদের ক্যামেরা ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সাংবাদিক নেতারা এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

শুধু সাংবাদিক নন, আন্দোলনের নামে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা হামলার ছবি-ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষও আক্রমণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতা ও  ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে সাংবাদিকরা মনে করছেন।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণার অভিযোগ তুলেছেন পোশাকশিল্পের মালিকেরা। তাদের অভিযোগ, পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কেউ কেউ ‘গার্মেন্টস শ্রমিক গাজীপুর’ নামের ফেসবুক গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে-বেনামে গ্রুপ ও অ্যাকাউন্ট খুলে বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব ও উসকানিমূলক পোস্ট দিচ্ছেন। এসব পোস্টের মাধ্যমে শ্রমিকদের ক্ষুব্ধ করে আন্দোলনকে আরো উত্তেজনাপূর্ণ করার চেষ্টা চলছে বলে তাদের দাবি। 

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি, আন্দোলনে সহিংসতা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ—সব মিলিয়ে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। শ্রমিকদের দাবি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পাশাপাশি সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলা-উসকানির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।