প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা আগমনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ জনপদের মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে বাঁধভাঙা উল্লাস, আনন্দ ও অভূতপূর্ব উদ্দীপনা। আগামী ৫ নভেম্বর খুলনা জেলা স্টেডিয়াম থেকে প্রধানমন্ত্রী একযোগে দেশের ৫০৩টি উপজেলায় উদ্বোধন করতে যাচ্ছেন শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভা অন্বেষণের সর্ববৃহৎ জাতীয় প্ল্যাটফর্ম ‘নতুন কুঁড়ি’-র দ্বিতীয় আসর।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবল একটি প্রশাসনিক কিংবা সাংস্কৃতিক উদ্বোধন নয়; বরং এটি তৃণমূলের কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার এক মিলনমেলা। এই সফরকে সফল ও সার্থক করতে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে উদ্দীপনা ছড়িয়ে দিতে খুলনার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

খুলনা মহানগর বিএনপির যৌথ প্রস্তুতি ও মতবিনিময় সভা প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর এবং ‘নতুন কুঁড়ি’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে সর্বোচ্চ উৎসবমুখর ও সুশৃঙ্খল করতে দিনব্যাপী প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে খুলনা মহানগর বিএনপি।

রোববার (১ নভেম্বর) মহানগর বিএনপি কার্যালয়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সমন্বয়ে এক ম্যারাথন যৌথ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টায় শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে চলা এই সভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি ও কেডিএ-র চেয়ারম্যান এডভোকেট শফিকুল আলম মনা এবং সভা পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক ও বিসিবি-র পরিচালক শফিকুল আলম তুহিন।

সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশের ঐতিহ্যগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি তরুণ সমাজকে মাদক ও হতাশা থেকে দূরে রেখে একটি সুস্থ, সবল এবং সৃজনশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর এই খুলনা সফর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হতে চলেছে।

শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করেছিল ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ও প্রতিভা অন্বেষণ প্ল্যাটফর্ম ‘নতুন কুঁড়ি’। বাংলাদেশ টেলিভিশনের আশির দশকের এই জনপ্রিয় মাধ্যমটির হাত ধরে অতীতে বহু প্রথিতযশা শিল্পী, গুণীজন এবং প্রতিভা জাতীয় অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এই ঐতিহ্যবাহী প্ল্যাটফর্মটি আবারও ফিরে এসেছে নব উদ্যমে।

‘নতুন কুঁড়ি’র দ্বিতীয় আসরকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে, তা এক কথায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী: এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেশের প্রায় ১৬ লাখ ২৩ হাজার তরুণ-তরুণী রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন। তুলনামূলকভাবে প্রথম আসরে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১ লাখ ৬৮ হাজার, যা বর্তমান প্রজন্মের মাঝে প্রতিভা প্রদর্শনের অদম্য আগ্রহকে স্পষ্ট করে তোলে। নিবন্ধিত প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে দেশের ৪,৫৯৯টি ইউনিয়নে সুনির্দিষ্ট দল গঠন করা হয়েছে। ইউনিয়নের দলগুলোর মাধ্যমে প্রায় ১৪ লাখ ক্রীড়াবিদ এই বিশাল ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছেন।

নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, শিশু-কিশোরদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে দক্ষ ও প্রতিশ্রুতিশীল ক্রীড়াবিদ গড়ে তুলতে এই উদ্যোগ অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। খেলাধুলাকে কেবল সাধারণ বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি শক্তিশালী, মেধাবী ও সুস্থ জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।

বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের সিংহভাগ কৃতি খেলোয়াড় উঠে আসেন সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। নানা প্রতিকূলতা, আর্থিক সংকট ও সামাজিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিভাবান তরুণ-তরুণী তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। বর্তমান সরকার এই বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দ মতবিনিময় সভায় জানান যে, খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য ও পারফরম্যান্স উন্নয়নের আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নানামুখী সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর ফলে খেলাপাগল তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ধরনের দুশ্চিন্তা ছাড়াই নিজেদের ক্রীড়া নৈপুণ্যে পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারবে।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ও ‘নতুন কুঁড়ি’র কর্মসূচি সফল করতে খুলনার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। রোববারের সভায় বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে:

বেলা ১১টায় মহানগর ছাত্রদলের সাথে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. তাজিম বিশ্বাস এবং সভা পরিচালনা করেন সদস্য সচিব হাবিবুর রহমান বিপ্লব। উক্ত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহানগর বিএনপি ও কেডিএ-র চেয়ারম্যান এডভোকেট শফিকুল আলম মনা এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন।

সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন আরিফুর রহমান আরিফ, সৈয়দ ইমরান, রিয়াজুল খান মুরাদ, শাকিল আহমেদ, হাসান মাহমুদ, সজল হোসেন, নাজিম উদ্দিন শামীম, আব্দুল আহাদ শাহিন, এস এম ইউসুফ, আরিফুল ইসলাম আরিফ, ইমরান সালেহ সিফাত, হিমি বিশ্বাস প্রমুখ। নেতৃবৃন্দ ছাত্র সমাজকে সুশৃঙ্খলভাবে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উদযাপনে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।

দুপুর ৩টায় অনুষ্ঠিত মহিলা দলের সভায় সভাপতিত্ব করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও মহানগর মহিলা দলের আহ্বায়ক সৈয়দা নার্গিস আলী এবং সভা পরিচালনা করেন যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট হালিমা আক্তার খানম। এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক চৌধুরী হাসানুর রশিদ মিরাজ। এছাড়া সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মোল্লা ফরিদ আহমেদ, আনজিরা খাতুন, শাহনাজ সরোয়ার, নাসরিন হক শ্রাবনী প্রমুখ। মহিলা দলের নেতৃবৃন্দ বলেন, নারীদের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে কোনো জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো প্রতিযোগিতায় কন্যাশিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মহিলা দল মাঠে থেকে কাজ করবে।

প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফর এবং জাতীয় ‘নতুন কুঁড়ি’ উদ্বোধনী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুরো খুলনাঞ্চলজুড়ে এখন সাজসাজ রব। রাজপথ থেকে শুরু করে অলিগলি—সবখানেই উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে সাধারণ মানুষ আজ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে এবং একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখছে।

৫ নভেম্বরে খুলনার ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুধী সমাজ। তরুণ প্রজন্মের প্রাণে আশার প্রদীপ জ্বেলে ‘নতুন কুঁড়ি’র এই দ্বিতীয় আসর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অঙ্গনকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে—এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।