দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফেরাতে বড় ধরনের ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করেছে খুলনা রেঞ্জ পুলিশ। বেতন-ভাতার বাইরে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নেওয়া এবং বিভিন্ন থানা ও ইউনিটে ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একযোগে ২৮ জন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে। একই সঙ্গে অনিয়মে জড়িত থাকার অপরাধে দুই আউটসোর্সিং/বেসরকারি কর্মচারীকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

খুলনা রেঞ্জ উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) কার্যালয় থেকে নেওয়া এই একযোগে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিভাগের ১০ জেলার পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার—এই দুই দিনে প্রত্যাহার হওয়া পুলিশ সদস্যদের স্ব-স্ব জেলা পুলিশ লাইনস ও আঞ্চলিক আর্মড রিজার্ভ পুলিশে (আরআরএফ) সংযুক্ত করা হয়েছে। খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি মোঃ রেজাউল করিমের এই কঠোর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপকে সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহল সাধুবাদ জানালেও, অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে যুক্ত অসাধু কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে, এটি পুলিশের ভেতরে শুরু হওয়া ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযানের প্রাথমিক পদক্ষেপ মাত্র। তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধের সত্যতা নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খুলনা রেঞ্জের আওতাধীন বিভিন্ন জেলা, ট্রাফিক বিভাগ ও গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) কর্মরত অভিযুক্তদের তালিকা অনুযায়ী যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে: খুলনা জেলা (৯ জন): দিঘলিয়া থানার এসআই লিটন ও কনস্টেবল রব; পাইকগাছা থানার এএসআই রবিউল ও এসআই কামরুজ্জামান; কয়রা থানার এএসআই জাহিদ; রূপসা থানার এসআই শহিদুল; তেরখাদা থানার বাবুর্চি সোহেল; ডুমুরিয়া থানার কনস্টেবল মহাসিন এবং ডিবি কনস্টেবল রাসেল ও ইমরুল।

বাগেরহাট জেলা (৯ জন): সদর থানার আব্দুল্লাহ আল মামুন; মোল্লাহাট থানার পুলক বিশ্বাস; চিতলমারী থানার মোঃ জাহিদুর রহমান; ফকিরহাট থানার এএসআই অমিত কুমার মন্ডল; রামপাল থানার স্বরূপ হালদার; মোরেলগঞ্জ থানার এএসআই মোঃ কিশোর কুমার; শরণখোলা থানার এএসআই তুষার কান্তি পাল; ডিএসবি সদস্য মোহাম্মদ আহাদ আলী এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) আনিসুর রহমান।

যশোর জেলা (২ জন): কোতোয়ালি মডেল থানার এএসআই বাবর আলী ও চৌগাছা থানার এএসআই শান্ত।

ঝিনাইদহ জেলা (৩ জন): সদর থানার এসআই রোকনুজ্জামান ও কনস্টেবল রবিউল ইসলাম এবং কালিগঞ্জ থানার এএসআই সোহাগ হোসেন।

কুষ্টিয়া জেলা (৪ জন): দৌলতপুর থানার এসআই লিংকন সরকার; ভেড়ামারা থানার কনস্টেবল রাকিব হোসেন ও কনস্টেবল জাকির হোসেন এবং ট্রাফিক শাখার কনস্টেবল সৈয়দ মোল্লা। চুয়াডাঙ্গা জেলা (১ জন): ট্রাফিক কনস্টেবল আকরাম।

বেসরকারি কর্মচারী অপসারণ (২ জন): খুলনার দাকোপ থানার ঝাড়ুদার রাসেল এবং বাগেরহাটের মোংলা থানার কর্মচারী মোহাম্মদ আলম হোসেন।

আইন প্রয়োগ, অপরাধ প্রতিরোধ ও নাগরিক সেবা সুনিশ্চিত করা পুলিশের মূল দায়িত্ব। কিন্তু কিছু সদস্যের ব্যক্তিগত স্বার্থ অনৈতিক সুবিধার দিকে ধাবিত হলে বাহিনীর সামগ্রিক ভাবমূর্তি ও প্রতিশ্রুতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। অর্থ বা অন্য কোনো সুবিধার বিনিময়ে মামলা গ্রহণ, তদন্ত কিংবা অভিযানে পক্ষপাতিত্ব করলে সর্বসাধারণের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সরকার ও বিভাগীয় প্রশাসন কর্তৃক পুলিশ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও সুবিধা বহুগুণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যই ছিল তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত সততা সুনিশ্চিত করা। সুবিধা বাড়ানোর পরও এমন অনৈতিক চর্চা কেবল ব্যক্তিগত অসততা নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও নির্দেশ করে। তাই কেবল বদলি বা ক্লোজড করার মধ্য দিয়েই প্রক্রিয়া শেষ না করে, দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা জরুরি।

খুলনা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. রেজাউল করিম এই পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারের যে 'জিরো টলারেন্স' নীতি রয়েছে, তা বাস্তবায়নে আমরা প্রথমেই নিজ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছি। কোনো সদস্যের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না। অনৈতিক সুবিধার লেনদেন আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং পুলিশের ওপর জনআস্থা তৈরিতে প্রধান বাধা।"

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কঠোর নির্দেশনা অনুযায়ী এই শুদ্ধি অভিযান চালানো হচ্ছে এবং খুলনা বিভাগে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে।