রক্তাক্ত হচ্ছে দক্ষিণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী ও শিল্পনগরী খুলনা। দিনের পর দিন বিবর্ণ হয়ে উঠছে এই নগরের চিরচেনা শান্ত রূপ। গত কয়েক দিন ধরে এখানে যে নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে, তাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই ঘটছে না, বরং পুরো নগরবাসীর বুকজুড়ে নেমে এসেছে এক গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার কালো ছায়া।

প্রশ্ন উঠেছে—এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে বা রাতের আঁধারে মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার লাইসেন্স কাদের হাতে? আর কত মায়ের কোল খালি হলে, কত স্বজনের আর্তনাদে ভারী হলে তবে থামবে এই রক্তের হোলিখেলা? সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনায় ঘটে যাওয়া দুটি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড শহরটিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে এক যুবককে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ক্ষত শুকোতে না শুকোতেই, পরদিন রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একইভাবে খুন হলেন খুলনা মহানগর তাঁতি দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ হুমায়ুন কবির। একের পর এক এমন বর্বরোচিত ঘটনায় খুলনার সাধারণ মানুষ এখন দিশেহারা। মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—আমরা কোথায় বাস করছি? আমাদের জীবন ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি তবে কোথায়?

রোববার (১ নভেম্বর) সন্ধ্যার ঘটনা। তখনো সন্ধ্যার অন্ধকার পুরোপুরি নামেটি। নগরীর রায়েরমহল বড় মসজিদ এলাকার স্থানীয় পরিবেশ বরাবরের মতো স্বাভাবিকই ছিল। ওই এলাকার সৈয়দ আনোয়ার আলীর পুত্র সৈয়দ হুমায়ুন কবির ব্যস্ত ছিলেন তাঁর নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘হিল ক্যান্টিনে’। কে জানত, এই শান্ত সন্ধ্যাটিই তাঁর জীবনের শেষ সন্ধ্যা হতে চলেছে?

প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হঠাৎ করেই একদল দুর্বৃত্ত অতর্কিতে ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ওই প্রতিষ্ঠানে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা হুমায়ুন কবিরকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। খুনিদের নারকীয় উল্লাসে মুহূর্তেই রক্তে ভেসে যায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির মেঝে। তাঁর চিৎবারে আশপাশের মানুষ এগিয়ে আসার আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। গুরুতর জখম ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিণতি—হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এই হত্যাকাণ্ডের পর হাসপাতাল চত্বরে তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। নিহতের স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। নিহতের ভাইপো সৈয়দ দিদারুল করিম বিপ্লব সংবাদমাধ্যম ও পুলিশকে অভিযোগ করে জানান, ছাত্রদল নেতা আরাফাত ও তাঁর সহযোগীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁর ছোট চাচা হুমায়ুন কবিরের ওপর হামলা চালিয়েছেন। তাঁরাই নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে তাঁকে।

খবর পেয়ে সোনাডাঙ্গা থানা এবং খালিশপুর থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তবে ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক মহানগর তাঁতি দলের আহ্বায়ক মো. আবু সাঈদ বলেন, “নিহত হুমায়ুন কবির আমাদের দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তাঁর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর শুনে আমি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে এসেছি। কিন্তু কেন বা কারা এই কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কিছু জানতে পারিনি।”

এদিকে আড়ংঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হালিমুর রহমান জানান, “বিষয়টি আমরা শুনেছি। তবে এটি কোথায় এবং ঠিক কীভাবে ঘটেছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানতে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

হুমায়ুন কবিরের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে খুলনার লবণচরা থানাধীন এলাকায় ঘটে আরেকটি খুনের ঘটনা। কাশেমিয়া জামে মসজিদ থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে রাস্তার ওপর থেকে শহীদুল ইসলাম কলিন (৩৫) নামের ওই যুবকের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত কলিন ওই এলাকার মাহতাব উদ্দিনের ছেলে।

স্থানীয় ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহত কলিন পেশাগত বা ব্যক্তিগত কারণে সাধারণত দুই-তিন দিন পরপর বাড়িতে আসতেন। ঘটনার দিন শনিবার বিকেলে তিনি বাড়ি আসেন। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঘর থেকে বের হন। কিন্তু কে জানত, এই ঘর থেকে বের হওয়াই তাঁর চিরজীবনের বিদায়বেলা? রাত ১১টার দিকে বাড়ি থেকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে রাস্তার ওপর তাঁর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় এক ব্যক্তি তাঁর পরিবারকে খবর দেন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ বিষয়ে লবণচরা থানার অফিসার ইনচার্জ সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, নিহত যুবকের বিরুদ্ধে পূর্বে সাতটি মাদক মামলা এবং একটি হত্যা মামলা রয়েছে। তিনি সচরাচর বাড়ির বাইরেই অবস্থান করতেন এবং মাঝেমধ্যে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। শনিবারও একইভাবে বাড়িতে এসে সন্ধ্যার দিকে বের হয়েছিলেন। পরবর্তীতে স্থানীয়দের মাধ্যমে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়। পুলিশ পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখছে।

একটি সভ্য সমাজে এমন ঘন ঘন রক্তপাত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দুটি ভিন্ন ঘটনার চিত্র ভিন্ন মনে হতে পারে, কিন্তু পরিণতি তো একটাই—একটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়া, একটি পরিবারের চিরতরে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া। আইনের শাসনহীনতা এবং অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় না থাকার কারণেই কি আজ অপরাধের মাত্রা এমন দানবীয় রূপ ধারণ করেছে?

খুলনার সাধারণ মানুষ আজ শঙ্কিত। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী—কারো মনেই আর স্বস্তি নেই। তারা চায় দ্রুত এসব হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রকৃত খুনীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হোক। কোনো প্রভাবশালী বা অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায়।

একটি সুন্দর, শান্তিময় খুলনা আমরা দেখতে চাই, যেখানে প্রতিটি মানুষ নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবে, রাতে সুস্থভাবে ঘরে ফিরতে পারবে। প্রশাসনের কঠোর ও দৃশ্যমান হস্তক্ষেপে দ্রুত এই খুনোখুনির সংস্কৃতি বন্ধ হোক—এটাই এখন সর্বস্তরের মানুষের আকুল প্রার্থনা। আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়, আর কোনো স্বজন যেন এমন আহাজারি না করে। খুলনার মাটি আর রক্তে ভেজা দেখতে চায় না কেউ।