এই বিরোধের সূত্রপাত ২০১৯ সালের একটি প্রজ্ঞাপনকে কেন্দ্র করে। ওই বছরের জানুয়ারিতে ৯৫ জন কর্মকর্তাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে কয়েক মাসের মধ্যে সেই প্রজ্ঞাপন বাতিল করা হয়। পরে ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে জানায়, ওই কর্মকর্তাদের ক্যাডারভুক্তির সুপারিশসংক্রান্ত কোনো রেকর্ড কমিশনে পাওয়া যাচ্ছে না।
এর আগে, ২০১২ সালে বিধিমালা ও শূন্যপদের অভাবে পিএসসির সুপারিশপ্রাপ্ত ৩২ জন নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করার সুযোগ নাকচ করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০১৯ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ১৯৫টি নতুন ক্যাডার পদ সৃষ্টি করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব পদ সৃষ্টির প্রজ্ঞাপনে পেছনের তারিখ থেকে কার্যকারিতা দেওয়ার কোনো আদেশ ছিল না।
পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ১৫ জুন ৯০ জন কর্মকর্তাকে তাদের রাজস্ব খাতে যোগদানের আগের তারিখ থেকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০১২ সালের ৮ অক্টোবরের একটি পত্র অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে এসব পদের অস্তিত্ব ছিল না বলে দাবি করছেন বিসিএস কর্মকর্তারা। তাদের প্রশ্ন, যে সময় পদই ছিল না, সে সময় থেকে কীভাবে ওই কর্মকর্তাদের ক্যাডারভুক্ত করা হলো? অভিযোগ রয়েছে, ক্যাডারভুক্তির আদেশের পর মন্ত্রণালয়ে কোনো যোগদানপত্রও জমা দেওয়া হয়নি।
বিরোধের মূল প্রশ্ন এখন পরবর্তী সময়ে ক্যাডারভুক্ত হওয়া কর্মকর্তাদের আগের চাকরিকাল জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গণনা করা হবে কিনা। এ বিরোধ গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। ২০২২ সালে ৬৩ জন কর্মকর্তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী পদোন্নতির আগে পূর্ণাঙ্গ জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরির শর্ত রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, সরাসরি বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাগত হতাশা তৈরি হয়েছে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পিএসসি ও সরকারের নিয়োগবিধি অনুসরণ না করে ২০১৭ সালের আগের ৯০ জন প্রকল্প ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তারিখেরও আগে থেকে ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিসিএস পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানানো হয়েছে। এ নিয়ে অধিদপ্তরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কেউ এ প্রক্রিয়ায় বিশেষ মহলের প্রভাব ও সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিসিএস কর্মকর্তা বলেন, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী, একজন নিয়মিত বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাকে নবম গ্রেড থেকে ষষ্ঠ গ্রেডে (সিনিয়র স্কেল) পদোন্নতি পেতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষা ও সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এরপর আরও পাঁচ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করলে তিনি পঞ্চম গ্রেডে পদোন্নতির যোগ্য হন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, বিগত সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে কিছু পদ সৃষ্টি করে ২০১৭ সালের আগের ৯০ জন প্রকল্প ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করা হয়। ২০২২ সালে তাদের ক্যাডারভুক্তির আদেশে যোগদানের তারিখ স্পষ্ট করা হয়নি। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নিয়মিত বিসিএস কর্মকর্তারা ১০ বছর চাকরি করেও যেখানে নবম গ্রেডে আটকে আছেন, সেখানে ক্যাডারভুক্তির মাত্র তিন মাসের মধ্যে ওই কর্মকর্তাদের ৪৫ জনকে সরাসরি পঞ্চম গ্রেডে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হয়।
এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ বিসিএস কর্মকর্তারা ২০২২ সালে উচ্চ আদালতে মামলা করেন। মামলাটি এখনো বিচারাধীন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পঞ্চম গ্রেডের সুবিধা ভোগ করছেন। এমনকি তারা ষষ্ঠ গ্রেডের সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ারও চেষ্টা করছেন। বিসিএস কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারি চাকরির নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থার শৃঙ্খলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
চাকরির বিধানাবলি বিষয়ক বইয়ের লেখক মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এ বিষয়ে বলেন, বিধিগতভাবে ক্যাডারভুক্তির মাত্র তিন মাসের মধ্যে কাউকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার সুযোগ নেই। এভাবে তড়িঘড়ি করে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে, ২০২২ সালের ১৯ জুন বিসিএস পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিবের কাছে একটি লিখিত আবেদন করা হয়। এতে ৯০ জন কর্মকর্তাকে ক্যাডারভুক্ত করার প্রজ্ঞাপন সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়।
সংগঠনের সভাপতি বিলকিস আকতার ও সাধারণ সম্পাদক ইবনে মায়াজ প্রামাণিক স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে ক্যাডার পদ সৃষ্টির আগেই অস্তিত্বহীন ক্যাডার পদে ৯০ জন সহকারী প্রকৌশলীকে ভূতাপেক্ষভাবে ক্যাডারভুক্ত করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রকৌশল জনস্বাস্থ্য) গঠন ও ক্যাডার বিধিমালা, ১৯৮০-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আবেদনে আরও বলা হয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ক্যাডারভুক্ত পদের দুই-তৃতীয়াংশ সরাসরি নিয়োগের বিধান রয়েছে। অথচ ৯০ জনকে ভূতাপেক্ষভাবে ক্যাডারভুক্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন সচিবালয় কোনো সুপারিশ করেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী বলেন, রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির তারিখেরও ১৮ বছর আগ থেকে ওই ৯০ জনকে ক্যাডারভুক্তির সুবিধা দেওয়ায় অধিদপ্তরের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ অনেক কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতায় পিছিয়ে পড়েছেন। এতে তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা বিরাজ করছে।
এমএম












