দেশের প্রখ্যাত ইসলামী শিক্ষাবিদ, গবেষক ও অধ্যাপক ড. এ. এইচ. এম. ইয়াহইয়া রহমান শিক্ষকতা, গবেষণা, লেখালেখি ও সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ইসলামী শিক্ষা ও গবেষণার প্রসারে তাঁর ভূমিকা, দেশ-বিদেশে শিক্ষাদান এবং অসংখ্য গবেষক তৈরির মধ্য দিয়ে তিনি এক বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের স্বাক্ষর রেখে গেছেন।

১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুলনার কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের সুন্দরবনসংলগ্ন গোলাখালী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মরহুম হাফেজ সুলতান উদ্দিন সরদার এবং মাতা মরহুমা আমিনা সুলতানা। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।

শৈশব থেকেই পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দেন ড. ইয়াহইয়া রহমান। ১৯৬১ সালে সাতক্ষীরার বন্দরকাঠি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল, ১৯৬৫ সালে আগরদাঁড়ী আমিনিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম এবং ১৯৬৭ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে ফাজিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আলিম পরীক্ষায় মাদ্রাসা বোর্ডে ১২তম স্থান অর্জন করে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে শর্ষিনা দারুসসুন্নাত কামিল মাদ্রাসা থেকে হাদিস বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে ষষ্ঠ স্থান এবং ১৯৭২ সালে ফিকহ বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। পরে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, ঢাকা থেকে তাফসির বিভাগে কামিল সম্পন্ন করে ‘কামিল ট্রিপল’ ডিগ্রি অর্জন করেন।

মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সাধারণ শিক্ষায়ও কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১৯৭১ সালে সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজ, মাদারীপুর থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে ১৯৭৪ সালে অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে দ্বিতীয় এবং ১৯৭৫ সালে মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। মাস্টার্সে তিনি কলা অনুষদে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৭৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে দ্বিতীয় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।

১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধীনে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। সৌদি আরবের কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে আরবি ভাষায় ডিপ্লোমা পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

**কর্মজীবন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান**

ছাত্রজীবনেই তাঁর শিক্ষকতা শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে মাদারীপুর আহমাদিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় তৃতীয় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন। পরে শর্ষিনা মাদ্রাসায় সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে সরকারি কারমাইকেল কলেজ, রংপুরে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে সরকারি কবি নজরুল কলেজ, ঢাকায় শিক্ষকতা শুরু করেন।

১৯৮১ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরবি বিশেষজ্ঞ হিসেবে রিয়াদে যোগ দেন। সেখানে প্রায় আট বছর অবস্থানকালে চাকরির পাশাপাশি গবেষণা ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নিয়মিত তাফসির পরিচালনা করেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।

দেশের টানে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৯১ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে একই বিভাগের পাশাপাশি দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান এবং থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকদের পেশাজীবী সংগঠন গ্রিন ফোরামের সভাপতিও ছিলেন একাধিকবার। দীর্ঘদিন একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য থাকার পাশাপাশি ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হিসেবে বিবেচিত হন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্টাডিজ জার্নালের চারটি খণ্ড এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৯২ ও ২০০৪ সালের সমাবর্তন স্মারক সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন।

**গবেষণা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা**

ড. ইয়াহইয়া রহমানের গবেষণার ক্ষেত্র ছিল ইসলামী শিক্ষা, কুরআন-হাদিস, আরবি সাহিত্য, মুসলিম সভ্যতা এবং সামাজিক সমস্যা। তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র দেশি-বিদেশি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ভারতের প্রসিদ্ধ সাময়িকী ‘আল বা’ছ আল ইসলামী’-তে ‘বাংলাদেশে ইসলাম কখন এসেছে’ শিরোনামে তাঁর একটি গবেষণা দুই পর্বে প্রকাশিত হয়।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণার মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা: সমস্যা ও তার সমাধান’, ‘মুসলিম বিশ্ব: অধঃপতনের কারণ ও তার প্রতিকার’, ‘অমুসলিমদের কুরআন চর্চা’, ‘আল্লামা নিয়ায মাখদুম: বাংলাদেশে হাদিস শিক্ষাদানে তাঁর অবদান’, ‘সামাজিক অবক্ষয় ও মাদকরোধে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং ‘সুরা ফাতিহার তাফসির: তুলনামূলক আলোচনা’। ইংরেজিতে আরবি কবিতা, নারী ও বিভিন্ন ধর্ম এবং মুসলিম মনীষীদের অবদান নিয়েও গবেষণা করেন তিনি।

তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মাওয়ালী এবং ইসলামী উলুমে তাঁদের অবদান’ এবং ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর জীবনী।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৭ সালে রিয়াদে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৯৭ সালে ঢাকায় জাতীয় শিক্ষা সেমিনারে ইসলামী শিক্ষা বিষয়ক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। ১৯৯৮ সালে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। ২০০২ সালে ঢাকায় উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিতকরণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনারেও অংশগ্রহণ করেন।

**গবেষক তৈরি ও সমাজসেবায় অবদান**

শিক্ষক ও গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১২ জন গবেষক এমফিল এবং ১০ জন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাতীয়, উন্মুক্ত ও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষকতার বাইরে বৃক্ষরোপণ, সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধপ্রবণতা রোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, মসজিদ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা এবং অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদানের মতো জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।

খতিব হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল বিস্তৃত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিনি একাধিকবার জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ খতিব হিসেবে স্বীকৃতি ও পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের কেন্দ্রীয় মসজিদ, টিকাটুলি মসজিদ এবং কুষ্টিয়ার কোর্টপাড়া জামে মসজিদে জুমার খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত থাকার পাশাপাশি ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে দীর্ঘদিন বিশেষ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ মসজিদ মিশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি হিসেবেও কাজ করেন। আল-মুনতাদা আল-ইসলামী ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (বিআইআইটি) কার্যক্রমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দেশে ইসলামী শিক্ষার প্রসার এবং এ ক্ষেত্রে সংকোচনমূলক নীতি প্রতিরোধে আলেমদের বৃহত্তর ঐক্য গঠনের উদ্যোগেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

তিনি বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিভাগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ছিলেন।

শিক্ষা, গবেষণা, ধর্মীয় খেদমত ও সমাজসেবায় অবদান রাখা এই শিক্ষাবিদ ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠন শোক প্রকাশ করে। শিক্ষকতা, গবেষণা এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের ইসলামী শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।