ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। রোববারের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার সকালে আবারও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে জেলায় ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ শুরু করেন। গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, ওই সময় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার শ্রমিক সড়কে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও মৌচাকসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন।
আন্দোলনের নামে যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি না হয়, সে লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঠে রয়েছে। অন্যান্য বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মোঃ আরিফ হোসাঈন সকাল ৮টা ২৬ মিনিটে পাঠানো ক্ষুদে বার্তায় বিজিবি মোতায়েনের তথ্য নিশ্চিত করেন।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। সোমবার মহানগরীর ভোগড়া বাইপাস থেকে নাওজোর পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে তাঁদের উপস্থিতি দেখা যায়।
গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকর্মীরা মহাসড়কের পাশে অবস্থান নেন। অন্যদিকে গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারের নেতৃত্বে কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকায় নেতাকর্মীরা অবস্থান করেন।
গাজীপুর মেট্রো বাসন থানা বিএনপির সভাপতি তানভীর সিরাজ বলেন, মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সচল রাখা, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমানো এবং বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে ভোগড়া বাইপাস থেকে নাওজোর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে বিএনপি নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ চলছে। রোববার সকালে কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা প্রথমে সড়কে অবস্থান নেন। পরে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা যোগ দিলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নেওয়ায় দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন আটকা পড়ে। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা অবরোধের পর দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ ও বিজিবির তৎপরতায় ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
রোববারের আন্দোলন চলাকালে কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় কয়েকটি কারখানার ফটকে ভাঙচুর এবং একটি কারখানার গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মৌচাক এলাকায় ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়। কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে একটি পুলিশ বক্স এবং আনসার একাডেমির সামনে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, শ্রমিক ও সাংবাদিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কয়েকজনকে আটকও করা হয়েছে।
আন্দোলনের প্রভাবে রতনপুর, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্প পুলিশের হিসাবে, রোববার দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত গাজীপুরে ৪৫টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। অন্যদিকে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে ৫২৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণার তথ্য উঠে এসেছে।
শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। এ অবস্থায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছেন তাঁরা। শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে চলমান শ্রম অসন্তোষের কারণে একদিকে উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান এবং সহিংসতা এড়িয়ে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এখন শিল্পাঞ্চলের প্রধান চ্যালেঞ্জ।












