ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের টানা বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে এখনো বিরাজ করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। গত দুই দিনের সহিংসতার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নতুন করে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন ১০ থেকে বাড়িয়ে ১১ প্লাটুন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ২১ থেকে বাড়িয়ে ২৫ জন করা হয়েছে।

সোমবারের সহিংসতায় পুলিশের গাড়িতে আগুন, পুলিশের গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনায় শিল্প পুলিশ, মহানগর ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এসব ঘটনায় ৩০ জনকে আটক করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এর বাইরে কালিয়াকৈরে আরও ১২ জনকে আটকের কথা জানিয়েছে থানা পুলিশ।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল ও মহাসড়কগুলোতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। তবে সকাল ৮টার কিছু আগে কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায় কয়েকজন শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেন।

এতে কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। এরপর নতুন করে কোথাও মহাসড়ক বা আঞ্চলিক সড়ক অবরোধের খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের দলবদ্ধভাবে কাজে যোগ দিতে দেখা গেছে। তবে নাওজোর, ভোগড়া, কোনাবাড়ী, মৌচাক, সফিপুর ও পল্লীবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন এলাকার ছোট সড়ক ও কারখানার আশপাশে শ্রমিকদের ছোট ছোট দলে অবস্থান করতে দেখা যায়।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শিল্প পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল ও সতর্ক অবস্থান অব্যাহত রেখেছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে আসেন। এর মধ্যে মৌচাক এলাকায় কয়েকজন শ্রমিক মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ দ্রুত তাদের সরিয়ে দেয়।

এ ঘটনা ছাড়া গাজীপুরের কোথাও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি। তবে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের ছোট ছোট দল অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখছে। শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিভিন্ন এলাকার ২০ থেকে ২৫টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। নতুন করে ১০ থেকে ১২টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে কতটি কারখানা পুনরায় চালু হয়েছে, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি তিনি।

পুলিশ সুপার আরও জানান, শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি, গাজীপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে একটি এবং কালিয়াকৈর থানায় একটি মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এসব মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামি করা হয়েছে। আগের ঘটনায় আটক ৩০ জনের সংশ্লিষ্টতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহিদুল ইসলাম জানান, সোমবার দিবাগত রাতে মৌচাক এলাকা থেকে ইউনিয়ন যুবলীগের প্রচার সম্পাদক পারভেজকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্দোলন-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কালিয়াকৈর এলাকা থেকে আরও ১২ জনকে আটক করা হয়েছে।

এর আগে সোমবার (২ নভেম্বর) শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কালিয়াকৈরের শফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লীবিদ্যুৎসহ মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী ও সালনা এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। নাওজোর ফ্লাইওভারে গাজীপুর জেলা পুলিশের দুটি পিকআপ ভাঙচুর এবং একটি পুলিশ ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়।

পুলিশের গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুরের খবর পাওয়া যায়। কালিয়াকৈর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা অবরোধের পর দুপুরের দিকে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরসহ বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। মহানগর পুলিশের আওতাধীন এলাকায় সোমবার কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি আইডি থেকে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহত ও আহত হওয়ার বিষয়ে পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এসব তথ্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। শ্রমিক ও নগরবাসীকে কোনো ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

অন্যদিকে গাজীপুর জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চলমান শ্রমিক আন্দোলনে সাধারণ শ্রমিকদের আড়ালে কোনো দুষ্কৃতকারী বা অশুভ চক্র যাতে সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা রাষ্ট্রীয় ও জনগণের সম্পদের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য পুলিশ ধৈর্য, সংযম ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, গাজীপুর জেলায় শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ কোনো গুলি ছোড়েনি এবং পুলিশের গুলিতে কোনো শ্রমিক আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেনি। জেলা পুলিশের দুটি পিকআপ ভাঙচুর ও একটি পুলিশ ট্রাকে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দুই পুলিশ কর্মকর্তা সামান্য আহত হয়েছেন। গুজব ছড়িয়ে শ্রমিকদের পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার অপচেষ্টা চলছে উল্লেখ করে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে জেলা পুলিশ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, মৌচাক, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও ভোগড়াসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকার মসজিদে মাইকে শ্রমিকদের উদ্দেশে ঘোষণা প্রচার করা হয়। ঘোষণায় সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে জানিয়ে শ্রমিকদের গুজবে কান না দেওয়া, উসকানিতে সাড়া না দেওয়া এবং আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফেরার আহ্বান জানানো হয়।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিকদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। ওই বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিও রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা বোর্ডের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য দাবি পেশ করতে পারবেন। মজুরি বোর্ডকে সম্মান জানিয়ে শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফিরতে চান। কিন্তু একটি মহল ভুল বুঝিয়ে তাদের আন্দোলনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ কারণে উসকানিতে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে মসজিদে মসজিদে মাইকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, শ্রমিক অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ১০ প্লাটুন বিজিবি ও ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেন। মঙ্গলবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি মোতায়েন বাড়িয়ে ১১ প্লাটুন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা বাড়িয়ে ২৫ জন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মোঃ আরিফ হোসাঈন মঙ্গলবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মোঃ শওকত হোসেন সরকার জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকেই তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছেন। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। শ্রমিকদের কেউ যেন ভুল বুঝিয়ে বা উসকানি দিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে না পারে, সে বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে বেতন বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শ্রমিকদের ধৈর্য ধারণ করে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্পকারখানা সচল থাকলে শ্রমিক, গাজীপুর ও দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে। কোনো উসকানিতে পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।

শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। কয়েক দিনের বিক্ষোভে শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি কারখানার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং সহিংসতা ও গুজব প্রতিরোধে প্রশাসন, পুলিশ, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।