- নাওজোর-ভোগড়া ও বাইপাস এলাকায় বিক্ষোভ
- টিয়ারশেল-সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ
- প্রায় দুই শতাধিক কারখানায় ছুটি
- চার মামলায় আসামি ৫ হাজার, গ্রেপ্তার ৪৫
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ আবারও ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে কয়েক ঘণ্টা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পর সকাল পৌনে ১০টার দিকে শ্রমিকরা নতুন করে মহাসড়কে অবস্থান নেন।
মহানগরীর নাওজোর, ভোগড়া বাইপাস, বর্ষা সিনেমা হলের সামনের এলাকা এবং গাজীপুর-চট্টগ্রাম বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের অবরোধে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
অবরোধকারীদের সরিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সহিংসতা এড়াতে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। শিল্প পুলিশ ও জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৪ টি মামলায় প্রায় ৫ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে এবং ৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেন। এরপর কিছু সময় পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সকাল পৌনে ১০টার পর নাওজোর এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে ভোগড়া বাইপাস, বর্ষা সিনেমা হলের সামনের এলাকা ও গাজীপুর-চট্টগ্রাম বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কে আটকে পড়েন দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীরা। সৃষ্টি হয় তীব্র ভোগান্তি।
অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন। নাওজোর এলাকায় শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। অন্যদিকে মহানগরীর কোনাবাড়ী ও কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকায়ও বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সড়কে নামতে দেখা যায়। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় নতুন করে বড় ধরনের অবরোধ না থাকলেও শিল্পাঞ্চলে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে আসেন। এর মধ্যে কয়েকটি স্থানে শ্রমিকরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেন। নাওজোর এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে রয়েছেন এবং তাদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মঙ্গলবার এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন শিল্প এলাকায় পুলিশ মোতায়েন ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গাজীপুরের প্রায় দুই শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পুলিশ সুপারের দেওয়া ৫০টি কারখানার তথ্যটি মঙ্গলবারের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছুটির হিসাব। বিভিন্ন সময় ও এলাকার হিসাবের কারণে কারখানা বন্ধের সংখ্যায় ভিন্নতা রয়েছে।
শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় গাজীপুরে ৪টি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৫ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর আগে সোমবার পর্যন্ত ৩০ জনকে গ্রেফতারের তথ্য দিয়েছিল শিল্প পুলিশ। পরবর্তী সময়ে গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়েছে।
এর আগে সোমবার (২ নভেম্বর) গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। কালিয়াকৈরের শফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লীবিদ্যুৎসহ মহানগরীর ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী ও সালনা এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। নাওজোর ফ্লাইওভারে গাজীপুর জেলা পুলিশের দুটি পিকআপ ভাঙচুর এবং একটি পুলিশ ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুরের খবর পাওয়া যায়। কালিয়াকৈর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা অবরোধের পর দুপুরের দিকে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ ইসরাইল হাওলাদার জানিয়েছেন, শ্রমিক আন্দোলনের ব্যানারে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি বিভিন্ন স্থানে মহাসড়ক অবরোধ, কারখানার গেটে ধাক্কাধাক্কি ও ভাঙচুরের চেষ্টা চালায়। পুলিশ ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে। নাওজোর ফ্লাইওভারে জেলা পুলিশের দুটি পিকআপ ভাঙচুর এবং একটি পুলিশ ট্রাকে আগুন দেওয়ার ঘটনায় জেলা পুলিশের দুই কর্মকর্তা সামান্য আহত হন। তবে মহানগর পুলিশের আওতাধীন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহত ও আহত হওয়ার বিষয়ে ছড়ানো তথ্যকে তিনি পরিকল্পিত গুজব উল্লেখ করে শ্রমিক ও নগরবাসীকে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান।
গাজীপুর জেলা পুলিশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ কোনো গুলি ছোড়েনি এবং পুলিশের গুলিতে কোনো শ্রমিক আহত বা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ সংযম, ধৈর্য ও আইনানুগ পদ্ধতিতে দায়িত্ব পালন করছে। সহিংসতা, ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি গুজব ও অপপ্রচারে কান না দিতে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
এদিকে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কালিয়াকৈর, মৌচাক, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও ভোগড়াসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকার মসজিদে মাইকে ঘোষণা প্রচার করা হয়। ঘোষণায় সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে জানিয়ে শ্রমিকদের গুজবে কান না দেওয়া, উসকানিতে সাড়া না দেওয়া এবং আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফেরার আহ্বান জানানো হয়।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিকদের দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। ওই বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিও রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা বোর্ডের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য দাবি পেশ করতে পারবেন। মজুরি বোর্ডকে সম্মান জানিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে এসে কাজে ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে। একটি মহল ভুল বুঝিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েন ১০ প্লাটুন থেকে বাড়িয়ে ১১ প্লাটুন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা ২১ থেকে বাড়িয়ে ২৫ জন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও রিসার্চ সেল) মোঃ আরিফ হোসাঈন মঙ্গলবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কারখানার আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অবস্থান করতেও দেখা গেছে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি মোঃ শওকত হোসেন সরকার জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে তিনি নেতাকর্মীদের নিয়ে শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছেন। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে তারা সতর্ক রয়েছেন। শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য নেতাকর্মীরা মাঠে রয়েছেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব। শ্রমিকদের ধৈর্য ধারণ করে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্পকারখানা সচল থাকলে শ্রমিক, গাজীপুর ও দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।
মজুরি বোর্ড গঠন এবং সরকারপক্ষ, পোশাক কারখানার মালিক ও শ্রমিক নেতাদের মধ্যে আলোচনার পর কিছু কারখানার শ্রমিক কাজে ফিরেছেন। তবে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি। শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। একদিকে শ্রমিকদের দাবির সমাধান, অন্যদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ও মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা-এ দুই চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।












