খুলনা ব্যুরো

ঋতুচক্রের প্রচলিত নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে খুলনাঞ্চলে এখন গাছে গাছে ঝুলছে রসালো তরমুজ। যখন বাজারে তরমুজের কোনো নামগন্ধ থাকে না, ঠিক তখনই অফসিজন বা অসময়ের এই তরমুজ চাষ করে অর্থনৈতিক মুক্তির অন্বেষণ করছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। মাছের ঘেরের অব্যবহৃত বেড়িবাঁধ আর পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে স্বল্প পুঁবিতে অধিক লাভের মুখ দেখছেন তারা। কৃষি বিভাগের নানামুখী সহায়তা এবং কৃষকদের অদম্য উৎসাহে চলতি মৌসুমে খুলনাঞ্চলে প্রায় দুই শ’ কোটি টাকার অফসিজন তরমুজ বিক্রির অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক নতুন ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

সাধারণত গ্রীষ্মকালের তপ্ত রোদে তরমুজের সুবাস পাওয়ার কথা থাকলেও, এখন বছরের অন্য সময়েও ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা কিংবা দেবহাটার মাঠঘাট সবুজ হয়ে উঠছে তরমুজের মাচায়। আশির দশক থেকে খুলনাঞ্চলে ব্যাপকভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হওয়ার পর ঘেরের পাশের বিশাল বেড়িবাঁধগুলো বছরের পর বছর কোনো ধরনের ব্যবহার ছাড়াই পড়ে থাকত। ঘেরের মালিকরা শুধু মাছের ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান কৃষকরা সেই ধারণায় পরিবর্তন এনেছেন। পতিত জমি ও মাছের ঘেরের পাড়ে মাচা পদ্ধতিতে অফসিজন তরমুজ চাষ করে তারা আজ স্বাবলম্বী। ছোট আকৃতির নয়, বরং প্রতিটি তরমুজ ওজনে প্রায় ৫ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত হচ্ছে। বাজারে এর চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো পাওয়ায় কৃষকদের মুখে এখন হাসির ঝিলিক।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনাঞ্চলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে খুলনাঞ্চলের চার জেলায় অফসিজন তরমুজ চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮২০ হেক্টর জমি। গত অর্থবছরের তুলনায় এটি প্রায় ৫৯১ হেক্টর বেশি। এর মধ্যে শুধু খুলনায় ১ হাজার ৫১৭ হেক্টর, বাগেরহাটে ৬৮ হেক্টর, সাতক্ষীরায় ১৫১ হেক্টর এবং নড়াইলে ২৪ হেক্টর জমিতে আবাদ হচ্ছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের বিপরীতে চলতি মওসুমে অফসিজন তরমুজের সম্ভাব্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৪ হাজার ৭৬৬ মেট্রিক টন। জেলাওয়ারি হিসেবেÑ খুলনা জেলায় ৪৬ হাজার ৫১৫ মেট্রিক টন, বাগেরহাট জেলায় ২ হাজার ১২০ মেট্রিক টন, সাতক্ষীরা জেলায় ৫ হাজার ১৮২ মেট্রিক টন ও নড়াইল জেলায় ৭৩৪ মেট্রিক টন।

বর্তমানে স্থানীয় বাজারে কৃষকদের উৎপাদিত অফসিজন তরমুজ প্রতি কেজি গড়ে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এই বাজারদর অনুসারে পুরো অঞ্চলে উৎপাদিত তরমুজের মোট সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২১৮ কোটি ২০ লাখ ১২ হাজার টাকা। যার মধ্যে কেবল খুলনার কৃষকদের ঘরেই আসবে প্রায় ১৮৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। এছাড়া বাগেরহাটে ৮ কোটি ৪৮ লাখ, সাতক্ষীরায় ২০ কোটি ৭২ লাখ এবং নড়াইলে প্রায় ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।

খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের কেয়াখালি গ্রামের কৃষক ফারুক বিশ্বাস তার সাফল্যের কথা জানিয়ে বলেন, "ঘের পাড়ের দুই বিঘা জমিতে (প্রতি ৫০ শতকে এক বিঘা) আমি অফসিজন তরমুজ চাষ করেছি। বিঘা প্রতি আমার খরচ হয়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, আর তরমুজ বিক্রি করেছি ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায়। এই চাষ করে আমি বেশ লাভবান হয়েছি। তাছাড়া কৃষি প্রকল্পের আওতায় আমাদের নানা ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত খোঁজখবর নেন।"

একই উপজেলার কালিকাপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা করুনা ম-ল জানান, চলতি মওসুমে তার ব্লকেই ১৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন কৃষক তরমুজ চাষ করছেন। স্বল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় কৃষকদের মাঝে দিন দিন আগ্রহ বেড়েই চলেছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি অফিসার মো. নাজমুল হুদা জানান, এই উপজেলায় চলতি বছরে ৩১৫ হেক্টর জমিতে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার কৃষক অফসিজন তরমুজ চাষ করছেন। বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা হলেও মানভেদে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে ৫৫ থেকে ৮০ হাজার টাকায়। প্রায় ১১ শ জনের অধিক কৃষককে এ সময় বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি অফিসার মো. আবু বকর সিদ্দিক জানান, এই উপজেলায় চলতি বছর ৮২০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৫ হাজার কৃষক তরমুজ চাষ করছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২০০ হেক্টর বেশি। তিনি জানান, বিঘাপ্রতি খরচ ২০-২৫ হাজার টাকা হলেও কৃষকরা তা ১ লাখ ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করছেন।

অন্যান্য জেলার মধ্যে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ৩৭ হেক্টরে প্রায় তিন শতাধিক কৃষক এবং নড়াইলের কালিয়ায় ১৫ হেক্টর জমিতে কৃষকরা অফসিজন তরমুজ চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা জেলার উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম জানান, চলতি মওসুমে খুলনায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি জমিতে আবাদ অর্জিত হয়েছে (অর্জনের হার ১৫৫%)। মাছের ঘেরের অব্যবহৃত জমিতে মাচা পদ্ধতিতে এই চাষাবাদ কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে যেমন স্বাবলম্বী করছে, তেমনি গ্রামীণ জনপদে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে।

সার্বিক বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, "চলতি অর্থবছরে খুলনাঞ্চলে ১৮২০ হেক্টর জমিতে অফসিজন তরমুজ চাষ হচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় ৬ শ’ হেক্টর বেশি। উৎপাদন খরচ কম এবং লাভের পরিমাণ বেশি থাকায় কৃষকরা এতে ঝুঁকছেন। উৎপাদিত এই তরমুজ একদিকে যেমন স্থানীয় পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।"