মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর অফিস

রংপুর অঞ্চলে চলতি মওসুমে হিমায়িত আলুতে কৃষকের লোকসানের আশংকা দেখা দিয়েছে অন্তত দুই হাজার কোটি টাকা।

সরকারিভাবে আলুর ক্রয় দর ২২ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবায়নে নেই কার্যকরী কোন উদ্যোগ। আলুর ন্যায্য দাম নিশ্চিতে মনিটরিং অব্যাহত রাখার দাবি সংশ্লিষ্টদের। জানা গেছে, এবারেও বীজ, সার, কীটনাশক, সেচসহ বিভিন্ন খাতে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২২ টাকা। হিমাগারে রাখায় প্রতি কেজি আলুতে উৎপাদন খরচসহ যোগ হয়েছে আরও ৭ টাকা। তবে বর্তমানে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯ থেকে সাড়ে ৯ টাকা।

এর ফলে চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগে শুধুমাত্র হিমায়িত আলুতে কৃষকদের লোকসানের আশংকা দেখা দিয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করে উৎপন্ন হয়েছে প্রায় ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ মেট্রিক টন। বিক্রির পরও বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে আলু মজুত রয়েছে ১১ লাখ ৯ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন। মৌসুমের শেষে সেই আলুর মজুত এখনও ৯ লাখ ৩৬ হাজার ২৮৩ টন রয়েছে বলে জানা গেছে। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষকরা বলেন, “আলু আবাদ করি এবার কবরোত যাওয়ার সময় ঘনি আলচে। আলুর পেছনোত তবিল বাট্টা হামার সউগ শ্যাষ। এ্যালা ঋণদফা থাকি আযার হমো কি দিয়ে সেই চিন্তাত নিন না ধরে। হামার পাকে দেকার কাইয়ো নাই। কোনটে পামো পুঁজি, হাউশ মিটি গেইচে আলু আবাদের।” 'এদিকে, কৃষকের লোকসানের কথা ভেবে সরকারিভাবে ২৭ আগস্ট হিমাগার থেকে আলুর দাম কেজি প্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও তার বাস্তবায়ন নেই। তবে ক্রেতা সংকটে সরকারি দর বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না দাবি কৃষি বিপণন অধিদফতরের। কৃষকের পাশাপাশি হিমাগারের ক্ষতি নিয়ে রংপুর কিষান হিমাগারের ম্যানেজার মাজেদুল ইসলাম বলেন, চলতি মওসুমে হিমায়িত আলু নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। তাই আলু হিমাগার থেকে খালাস না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে আলু খালাস না হলে কৃষকের পাশাপাশি হিমাগারগুলাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাম্পার ফলনেও কৃষকের কপালে ভাঁজ দূর করতে পরিকল্পিত চাষের পাশাপাশি বিশ্ব বাজারে দেশীয় আলুর চাহিদা তৈরিতে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের তাগিদ সংশ্লিষ্টদের। আলুর বহুমুখী ব্যবহার ও রফাতানি বৃদ্ধি হলে এই সমস্যা দূর হতে পারে।

রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, হিমাগার ভাড়া বেশি হওয়ায় আলু সংরক্ষণ করেও লোকসান ঠেকানো যাচ্ছে না। ভাড়া কমানোর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন হলেও হিমাগারের মালিকেরা তা মানছেন না। আমরা ৫ টাকা কেজি ভাড়া নির্ধারণের দাবি জানিয়েছি। এতে কিছুটা হলেও লোকসান কম হবে। এ বিষয়ে রংপুর কৃষি বিপণন অধিদফতরের উপ-পরিচালক এন.এম. আলমগীর বাদশা জানান, বিক্রি কম হওয়ার কারণে নির্ধারিত মূল্য ২২ টাকা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ যারা আলু বিক্রি করবেন, তারা ক্রেতা পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ এসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, আলুর দাম ১৩ টাকায় নেমে যাওয়ায় হিমাগার থেকে ধীর গতিতে আলু বের হচেছ। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫ টাকা, তাই লোকসানের ভয়ে তারা আলু তুলছেন না। গত বছরও দুই লাখ টন আলু উত্তোলন হয়নি। কৃষক আলু না নিলে আমরা ভাড়া পাব না, আবার পচন ঠেকাতে মেশিন চালিয়ে পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। সরকার কৃষককে ভর্তুকি দিয়ে, প্রয়োজনে আলু কিনে নিক।