সংকটে দিশেহারা দেশের লাখ লাখ কৃষক। যাদের শ্রম আর ঘামে উৎপাদন হয় ফসল তারাই আজ পড়েছে বিপাকে। একদিকে সারের সংকট চলছে অন্যদিকে লাগামহীনভাবে বেড়েছে ডিজেলের দাম। সারাবছর দেশে ডিজেলের চাহিদা রয়েছে সাড়ে ৪৩ লাখ টন তার মধ্যে শুধু কৃষিকাজে ব্যবহার হচ্ছে সাড়ে ১০লাখ টন। অথচ কৃষিকাজে ব্যবহারের অন্যতম জ্বালানি উপাদান ডিজেলের দাম ৫ মাসে বেড়েছে লিটারে ৩৫ টাকা। এতে করে কৃষিপন্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে কয়েকগুন। উৎপাদন করতে টাকা বেশি খরচের পর পণ্যের সঠিক দাম পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছে কৃষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষকের এই দুশ্চিন্তা ও মুনাফার সংকোচন দেশের কৃষি খাতকে নতুন সংকটে ফেলতে পারে। যেসব কৃষক বর্গাচাষি বা প্রান্তিক পর্যায়ের, তাদের জন্য এই বাড়তি খরচ বহন করা আরও কঠিন। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের সঙ্গে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্র ব্যবহারকারী কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবধানও ক্রমশ বাড়ছে, যা কৃষি খাতে বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বিভিন্নস্থানে সারের সংকট চলছে। সার না পেয়ে কোথাও কোথাও গুদাম ভেঙ্গে সার নিয়ে গেছে কৃষকরা। আর এ জন্য মামলায় বিপর্যস্ত অনেক কৃষক পরিবার। সারের সংকটের পর এবার ডিজেলের দাম বাড়লো। আমন মৌসুমে অনেক এলাকায় কৃষক সার সংকটে পড়েছেন, কোথাও বাড়তি দামেও সার কিনতে হচ্ছে। এর মধ্যেই ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে। সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমের খরচ বাড়ার পর ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে জমি প্রস্তুত, সেচ, ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন-প্রায় সব পর্যায়ের খরচ বাড়বে। কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ২,০৮৮ কোটি টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সব মানুষের ওপর পড়ছে। কৃষকদের ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারের দিক থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিজমিতে ডিজেলনির্ভর সেচের পরিবর্তে বিকল্প সৌরবিদ্যুত চালিত পাম্প বসানোর কাজ চলছে।

সূত্র জানায়, বোরো নিয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো থেকে, আর প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেল নির্ভর। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে বোরো উৎপাদনে। এর ফলে কৃষকের বোরো চাষে অনীহা তৈরি হতে পারে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ধানের দাম সেই অনুপাতে না বাড়লে কৃষক বোরো চাষ কমিয়ে দিতে পারেন এমন আশঙ্কা করছেন প্রান্তিক কৃষকরা।

এছাড়া ধানের দাম ও খাদ্যনিরাপত্তা বড় প্রশ্ন উঠেছে। কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে উৎপাদন কমতে পারে। এতে বাজারে চালের সরবরাহ কমে দাম বাড়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে চাল আমদানির প্রয়োজন বাড়তে পারে। ডিজেলের প্রভাব শুধু সেচে নয়। কৃষিতে ডিজেল ব্যবহৃত হয় জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহনেও। ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব পুরো কৃষি উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) হিসাব অনুযায়ী, কৃষিযন্ত্রগুলোতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১২ লাখ ৫৫ হাজার টন ডিজেল ব্যবহার হয়। সংস্থাটি বলছে, কৃষিখাতে ব্যবহৃত হয় দেশের বার্ষিক জ্বালানি ব্যবহারের ১৫ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশে ২১ লাখের বেশি কৃষিযন্ত্র রয়েছে, যার মধ্যে ৩ লাখ ৮০ হাজার পাওয়ার টিলার এবং ১২ লাখের বেশি ডিজেলচালিত সেচপাম্প। এসব যন্ত্র প্রধানত শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়, তার প্রায় ৫৫ শতাংশই বোরো।

প্রান্তিক কৃষকরা বলেছেন, ডিজেলের দাম বাড়ায় জমি চাষ, সেচ, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য তাদের আরও বেশি টাকা খরচ করতে হবে। ফলে, চাষাবাদের ব্যয় আরও বাড়বে। বিশেষ করে নভেম্বর থেকে তারা যখন আমন ধান কাটবেন ও মাড়াই করবেন এবং বোরোর বীজতলা প্রস্তুত করবেন সেই সময়ে এসে এই খরচ বেড়ে গেল। অথচ, গত দুই বোরো মৌসুমে প্রত্যাশিত দাম পায়নি কৃষক এবং অনেকে উৎপাদন খরচও তুলতে পরেনি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে। কৃষিতে ডিজেলের ব্যবহার শুধু সেচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও কৃষিপণ্য পরিবহনেও ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই পড়বে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, আগের দামে কৃষকের বছরে ডিজেলে ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার ছয় কোটি টাকা। লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় সেই ব্যয় বেড়ে প্রায় ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় দুই হাজার ৮৮ কোটি টাকা।

নারায়ণগঞ্জে শষ্যভান্ডার খাতে বক্তাবলীর চরাঞ্চলের কৃষক মোমিন হোসেন দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ডিজেলের দাম বাড়ানোর সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আমাদের ওপরই পড়বে। বাড়তি এই খরচ কীভাবে মেটাব, জানি না।

তিনি বলেন, বোরো চাষে ব্যাপক সেচ প্রয়োজন হয়। হঠাৎ করে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। অথচ গত দুই মৌসুম ধরে আমরা ধানের ন্যায্য দাম পাই না। লোকসানে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি।’

বক্তাবলী মধ্যনগরের কৃষক খালেক পলোয়ান দৈনিক সংগ্রামকে জানান, সেচের জন্য যাদের শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাদের তো খরচ আরও বেশি বাড়বে। ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারনে তখন দেখা যাবে, অনেকেই চাষাবাদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হবেন। আর জ্বালানির দাম বাড়লে অন্য সবকিছুর দামও বাড়বে। সামনে কীভাবে সব সামলাব, সেটাই ভাবছি।

সোনারগায়ের পিরোজপুর দুধঘাটা গ্রামের ৬০ বছর বয়সী কৃষক হামিদুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ‘ডিজেল ছাড়া কৃষিকাজের কথা চিন্তাই করা যায় না। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি সরাসরি কৃষকের জীবন ও জীবিকায় প্রভাবফেলবে।

এদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি প্রধান জেলার কৃষিকরাও সার সংকট এবং জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় দিশেহার হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ধান উৎপাদনের জেলা নওগাঁয় দিশেহারা কৃষক। একই ভাবে দিনাজপুর রংপুরসহ কৃষিপ্রধান জেলা গুলোতে কৃষকদের দুশ্চিন্তার প্রহর চলছে।

নওগাঁ জেলার হোগলবাড়ী গ্রামের কৃষক মাহবুব তালুকদার সাংবাদিদের বলেন, এবার আমন চাষে সব মিলিয়ে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে সার ও সেচের খরচ বেড়েছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ায় ধান মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। তিনি বলেন, ‘আমনেই যদি এত খরচ হয়, তাহলে বোরোতে কী হবে, সেটা ভাবতেই ভয় লাগে। বোরোতে সেচ লাগে অনেক বেশি। তাই এবার সেচ কম লাগে এমন ফসল করার চিন্তা করছি।’

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে এবং ইতোমধ্যে উচ্চ ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে।

তারা কৃষকদের নগদ সহায়তা ও কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলে ভর্তুকির সুপারিশ করেছেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান মনে করেন,বাংলাদেশের কৃষি সেচের জন্য ডিজেলের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তাই ডিজেলের দাম বাড়লেও কৃষির জন্য নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃষকের বাড়তি খরচ সমন্বয়ে প্রণোদনা বা ভর্তুকির বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এসব সেচযন্ত্রের বড় অংশই ডিজেলচালিত। এ ছাড়া প্রায় ১৬ লাখ ডিজেলচালিত ছোট সেচযন্ত্র বা শ্যালো মেশিন রয়েছে। কৃষিতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির সংখ্যাও কম নয়। দেশে প্রায় ১০ হাজার কম্বাইন হারভেস্টার, কয়েক লাখ রিপারসহ মাড়াই, ঝাড়াই ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেলচালিত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বোরো মৌসুমকে কেন্দ্র করে ডিজেলের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। অর্থাৎ আগামী ডিসেম্বর থেকে যখন বোরো মৌসুমের প্রস্তুতি শুরু হবে, তখনই বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে হবে কৃষকদের।

এদিকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সম্প্রতি বলেছেন, সরকার কৃষকের পাশে আছে। ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে বলে স্বীকার করে তিনি জানান, এর প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।