দীর্ঘ ৩৫ বছর পর যাত্রা শুরু করা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ সোমবার (২৬ অক্টোবর)। তবে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মেয়াদ তিন মাস বাড়ানো হলেও রাকসুর মেয়াদ বাড়ছে না। গঠনতন্ত্রে মেয়াদ বাড়ানোর বিধান না থাকায় আজই বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম।
উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের গঠনতন্ত্রে মেয়াদ বাড়ানোর কথা নেই। সে জন্য আজই রাকসুর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। রাকসু ৩৫ বছর পর হয়েছে, আমরাও চাই রাকসু হোক। পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন রাকসু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হবে, তখনই এর আয়োজন করা হবে।’
এদিকে বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচনের সময়সূচি ও প্রস্তুতি নিয়ে স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রাকসুর বর্তমান নেতৃত্বও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না দেখায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সমাজকর্ম বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. আরিফ আলভি বলেন, ‘রাকসুর মেয়াদ আজ শেষ হলো। অথচ পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে কোনো আপডেট নেই। এ নিয়ে একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। রাকসু কোনো দয়া বা দান নয়, এটি আমাদের অধিকার। এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং নেতৃত্বের বিকাশ ঘটায়। একজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে অবশ্যই রাকসু চাই। অন্যথায় রাজপথে দেখা হবে। আমাদের অধিকার নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না।’
রাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সালমান সাব্বির বলেন, ‘আমাদের সফলতা কেবল আমরা কী করতে পেরেছি বা কী করতে পারিনি, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাকসুকে বাস্তবে রূপ দিতে পারা এবং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বাকি খাওয়া কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর ঊর্ধ্বে থেকে মেয়াদ শেষ করতে পারাটাই আমাদের আসল সফলতা বলে মনে করি।’
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর রাকসুর যাত্রা শুরু হওয়ায় পূর্ব অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞ পরামর্শদাতার অভাবে শুরুতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁরা যেসব কাজ করেছেন, তা থেকে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
সালমান সাব্বির আরও বলেন, ‘পরবর্তী রাকসু নির্বাচন ও নতুন সংসদের পথ সুগম করতে আমরা শুরু থেকেই কাজ করে আসছি। সর্বশেষ অধিবেশনে বর্তমান কোষাধ্যক্ষ স্যারকে গঠনতন্ত্র সংস্কার, নির্বাচনী তফসিল প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা স্যারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি।’
রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘ভিসি স্যার আমাদের জানিয়েছেন যে পরবর্তী নির্বাচন তিনি দেবেন। কিন্তু কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ আমরা এখন পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি না। এজন্য আমাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, আসলেই তিনি নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন দেবেন, নাকি সরকারের গ্রিন সিগন্যালের অপেক্ষায় থাকবেন। বিষয়টি ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
৩৫ বছর পর নির্বাচন
দীর্ঘ বিরতির পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ২৩টি পদের বিপরীতে নয়টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এতে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ সহসভাপতি (ভিপি) ও সহসাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২০টি পদে জয়ী হয়। হল সংসদগুলোর শীর্ষ পদগুলোতেও এ প্যানেলের প্রার্থীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। নির্বাচনের ১০ দিন পর ২৬ অক্টোবর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন।
১৯৫৭ সালে ‘রাসু’ নামে যাত্রা শুরু করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র সংসদ। সামরিক শাসনের কারণে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে ১৯৬২ সালে নাম পরিবর্তন করে ‘রাকসু’ করা হয়। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত মোট ১৪টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দীর্ঘ ৩৫ বছর রাকসুর কার্যক্রম বন্ধ ছিল। গত বছর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটে। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরবর্তী নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।












