বুধবার সকালে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘সায়েন্স পলিসি ডায়লগ অন ব্ল্যাক কার্বন অ্যান্ড আদার শর্ট লাইভড ক্লাইমেট পল্যুটেন্টস’ শীর্ষক সেমিনারে মাহ্দী আমিন এসব কথা বলেন।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তাই ক্ষতিপূরণ তহবিল বা 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' কার্যকর করা এবং পর্যাপ্ত জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে উন্নত দেশগুলোর সাথে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে কাজ করছে সরকার।
উন্নয়নের নামে কোনোভাবেই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা যাবে না:
উন্নয়নের নামে কোনোভাবেই প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করা যাবে না উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, অতীতে মেগাপ্রকল্পের নামে পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করা হয়েছে, তা থেকে আমাদের অবিলম্বে সরে আসতে হবে। ভবিষ্যৎ ও আগামী প্রজন্মের জন্য নির্মল বাতাস এবং বাসযোগ্য স্বদেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, পরিবেশ সুরক্ষায় শিল্পখাতকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার পাশাপাশি ‘গ্রিন ইন্ডাস্ট্রি’ এবং ‘লিড সার্টিফিকেশন’-এর আওতা বাড়িয়ে কাজ করা হচ্ছে। একই সাথে, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ গ্যাসকূপ খনন ও বিভিন্ন বিকল্প উৎসের কার্যকর ব্যবহার জোরদার করা হয়েছে।
টেকসই পরিবেশ সুরক্ষায় কেবল সরকারি নীতিমালাই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত অপরিহার্য। এই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা ও জ্ঞান বিনিময় কার্যক্রম ভবিষ্যতে আরও প্রসারিত করা হবে এবং সরকার এতে সর্বোচ্চ নীতিগত সহায়তা প্রদান করবে।
তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ সুরক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, তরুণ শিক্ষার্থীদের পরিবেশবান্ধব নতুন নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনী স্টার্টআপ নিয়ে কাজ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে এবং পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের যেকোনো কার্যকর উদ্যোগ ও গবেষণায় সরকার সবসময় সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দেবে।
পরিবেশ সুরক্ষায় বিএনপির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে:
রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশ সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়নের এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে সিএনজির মতো পরিবেশবান্ধব জ্বালানিচালিত যানবাহন প্রবর্তন, ক্ষতিকর পলিথিন ও প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ এবং পাটজাত পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রসারে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, বিগত বিএনপি সরকারগুলোর আমলে দেশব্যাপী সপ্তাহ, মাস ও বছরব্যাপী বৃক্ষমেলার আয়োজন এবং সামাজিক বনায়নের যে সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা আরও বৃহত্তর পরিসরে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
পরিবেশ বিষয়ক গৃহীত পদক্ষেপ ও অগ্রগতি:
সরকারের পরিবেশ বিষয়ক গৃহীত পদক্ষেপ ও অগ্রগতির কথা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন জানান, গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট রূপকল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, যা দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও স্পষ্ট ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনর্খননের একটি বৃহৎ কর্মসূচি পুরোদমে শুরু হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায় সরকারের বিশাল বৃক্ষমেলার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্যাপক বনায়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ এবং সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে 'পদ্মা ব্যারেজ' ও 'তিস্তা মহাপরিকল্পনা' বাস্তবায়নে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়:
উচ্চমানের গবেষণা, নতুন উদ্ভাবন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণার বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমন যৌথ অংশীদারিত্বকে সরকার আন্তরিকভাবে স্বাগত জানায়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করা আমাদের অন্যতম প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিদলে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহ্দী আমিন জানান, বিশ্ব নেতাদের বিভিন্ন পার্শ্ববৈঠকেও বাংলাদেশ পরিবেশগত সহনশীলতা ও জলবায়ু সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছে। চরম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে কীভাবে টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা যায়-সেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক দরবারে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে বলে তিনি জানান।
সেমিনারে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুল-আওয়াল এবং সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস উপস্থিত ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আব্দুস সালাম ও স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওরজান গুসটাফসোন।
এমএম












