কুড়িগ্রাম থেকে মোস্তাফিজুর রহমান : বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধকারী সন্ত্রাসী বাহিনীর গডফাদার, মাদক ব্যবসায়ী, বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়ন যুবলীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাধারণ সম্পাদক, বহু মামলার আসামি মিজানুর রহমান মিজুর ছোট ভাই, চিহ্নিত মাদক কারবারি ও ভূমিদস্যু আব্দুর রাজ্জাককে সম্প্রতি মাদকদ্রব্যসহ গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে কুড়িগ্রামের কচাকাটা থানার পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কচাকাটা থানার চৌকস পুলিশ অফিসার ইনচার্জ, অপরাধ দমনে আপসহীন ওসি মোঃ নাজমুল আলম।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলাধীন বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক, কুখ্যাত সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ, হত্যাসহ বহু মামলার আসামি মিজানুর রহমান মিজু বিগত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে অপারেশন ডেভিল হান্ট অভিযানে আটক হওয়ার খবরে এলাকায় স্বস্তি ফিরে আসে এবং মিষ্টি বিতরণ করেছেন এলাকাবাসী। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, মাত্র ১৭ দিনের মাথায় হাইকোর্ট থেকে জামিনে বেরিয়ে এসেই এলাকায় পুরোদমে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী ও স্থানীয় সচেতন মহল। ইতোমধ্যেই হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়া করেছে অনেক নিরীহ জমির মালিককে। যারাই মিজুর অপকর্মের মুখ খোলে, তাদেরকেই মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করতে থাকে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মিজু মাত্র কয়েক বছর আগেও ছিল ছিঁচকে চোর, ভূমিহীন, ভবঘুরে, ছিনতাইকারী এবং মাঝে মধ্যে কাজ করত কুলি হিসেবে সোনাহাট স্থলবন্দরে।
উল্লেখ্য যে, মিজু চুরি করে ধরা পড়ে জনতার হাতে কয়েকবার প্রহারের শিকারও হয়েছে বলে অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে। অথচ এ চোর, ভূমিহীন, কুলি ও মূর্খ মিজু আওয়ামী যুবলীগের ইউনিয়ন সেক্রেটারির পদ বাগিয়ে নিয়ে এখন কোটি টাকা আর বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক।
সোনাহাট বিজিবি ক্যাম্পের মোড়সংলগ্ন বানুরকুটি গ্রামের সিএন্ডবি রাস্তার একাংশ জবরদখল করে তিনতলার আলিশান বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছে। কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স, বিপুল স্বর্ণালংকার, প্রায় ১০ বিঘা জমি, লক্ষ লক্ষ টাকার মাদক কারবার, গরুর ব্যবসা, আরও দুটি সেমিপাকা বাড়ি ছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক আয়বহির্ভূত সম্পদের হিসাব দেওয়ার ভয়ে সন্ত্রাসী মিজু সেসব বিক্রি করে দেয়। এ ছাড়া মিজু তার ছোট ভাই রাজ্জাক ও রনজুকে কয়েকটি দোকান-প্রতিষ্ঠান কিনে দিয়েছিল, স্ত্রী আনজিনা বেগমের নামে ৬৪ শতক জমিও কিনেছিল, পাথর ব্যবসার জন্য ভারতের অভ্যন্তরে ৫০ টনের দুটি ট্রাকও কিনেছিল; কিন্তু প্রশাসন কর্তৃক অনুসন্ধানের ভয়ে সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছে বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, মিজু ভূরুঙ্গামারী সদরে ৫ শতক, কুড়িগ্রামে প্রয়াত তারামন বিবির বাড়ির পূর্ব পাশে ধরলা বেড়িবাঁধ সংলগ্ন খলিল গাড়িয়াল (মিজুর শ্বশুর) বাড়ি এলাকায় ৪০ শতক ও রংপুরে মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি এলাকায় ৫ শতক জমি কিনেছে বলে জানান। মিজুর স্ত্রী আনজিনা বেগম একজন কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী। এলাকায় একজন মাদকসম্রাজ্ঞী হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। অথচ মিজুর পিতা আলিমুদ্দিন একজন দিনমজুর। বানুরকুটি গ্রামের শঠিবাড়ী নামক স্থানে ১৫/১৬ শতকের বসতবাড়ির মাটি ছাড়া তার আর কোনো সম্পত্তি নেই। প্রশ্ন হলো, মিজু কী করে এত কম সময়ে বিশাল বিত্তবৈভবের মালিক হয়ে গেল?
উত্তর একটাই, পতিত আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় মাদক কারবার, ভূমি দখলবাজি, চাঁদাবাজি, হুন্ডি কারবারিসহ নানাবিধ অপরাধ কর্মকাণ্ড।
বিগত ২৪ জুন ২০১৮ সালে লালমনিরহাট থেকে প্রকাশিত নতুন বাংলার সংবাদ-এর এক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানা যায়, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেশে ৬২৫ জন হুন্ডি কারবারির নাম প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে সোনাহাট স্থলবন্দরের কুখ্যাত হুন্ডি কারবারি মিজানুর রহমান মিজুর নাম রয়েছে।’
ভূমিদস্যু মিজু কর্তৃক জমি জবরদখলের বিবরণ: কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলাধীন বানুরকুটি মৌজাস্থ (সোনাহাট স্থলবন্দর) জে.এল. নং-৬৪, এস.এ. খতিয়ান নং-৪৪২-এর ১৯১৭ ও ১৯৪০ দাগে আয়নাল হক গংদের ১ একর ১৪ শতক, ১৯৩৯ ও ১৯৪০ দাগে মোন্নাফ গংদের ৮৩ শতক, ১৯৩৯ দাগে আঃ বাতেন গংদের ২২ শতক, ১৯৪০ দাগে আবু সুফিয়ানের ১২ শতক, খতিয়ান নং-৫১৩-এর ৩৫০ দাগে হাসর উদ্দিনের ৮ শতক, ৫০৯ খতিয়ানের ৩৫১ ও ৩৭৭ দাগে আব্দুর রাজ্জাক মন্ডল ও রেজিয়া খাতুনের ২৪ শতকসহ মোট ২ একর ৬৩ শতক জমি জবরদখল করে নিয়েছে। এ ছাড়া ভূমিদস্যু মিজু ১০৬২ ও ১০ নং এস.এ. খতিয়ানের ২৫৬, ৫১৯, ৫২০, ৫২-৫৭ নং দাগে ২৭ একর ৯৩ শতক জমির ভুয়া ও জাল (রেকর্ড) কাগজপত্র তৈরি করে ২৩ জনের জমি জবরদখলের পাঁয়তারা করে আসছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তার জবরদখলীয় এক শতক জমির মূল্য তিন লক্ষ টাকার ঊর্ধ্বে। এ জমিগুলো সোনাহাট স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক জমি হিসেবে পরিগণিত ও রাজস্ব করভুক্ত অঞ্চল। সেই হিসেবে ২.৬৩ একর জমির মূল্য দাঁড়ায় ২.৬৩ × ৩,০০,০০০/- = ৭,৮৯,০০,০০০/- (সাত কোটি ঊননব্বই লক্ষ টাকা)।
ভূমিদস্যু মিজু গরিব ও নিরীহ অসহায় জমির মালিকদের জমি জবরদখল করেই ক্ষান্ত হয়নি, উল্টো তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে, এমনকি হাজত পর্যন্ত খাটিয়েছে।
আরও উল্লেখ্য যে, সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যু মিজু আবু সুফিয়ান ও আঃ মোন্নাফ সহোদর দুই ভাইয়ের জমি জবরদখল করে নিয়েই থেমে থাকেনি; তাদের নামে ৭/৮টি মিথ্যা মামলা দিয়ে দীর্ঘদিন হাজতে রেখেছে, জামিন পর্যন্ত করতে দেয়নি। মিজু তাদের রাস্তায়, বাজার-হাটে বিভিন্ন সময় শারীরিক আঘাত করত। মিজুর উপর্যুপরি অত্যাচার আর মামলার চিন্তায় সহোদর দুই ভাই পরপর হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, আওয়ামী যুবলীগের ক্ষমতার জোরে এলাকায় ভীতি আর আতঙ্ক সৃষ্টি করে সন্ত্রাসী মিজু মাফিয়া কায়দায় একের পর এক অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে কোনো রকম বাধা ছাড়াই। তার বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে জামায়াত-শিবির তথা বিরোধী দলীয় ট্যাগ দিয়ে এমন লাগামহীন অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়েছে বলে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সন্ত্রাসী মিজু আওয়ামী লীগ সরকারের পদ-পদবির জোরে লাগামহীনভাবে মাদক ব্যবসাসহ সন্ত্রাসী কাজকর্ম করে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ছিঁচকে চোর থেকে কুলি, কুলি থেকে কোটিপতি বনে গেছে বলে জানায় এলাকাবাসী।
মাদকের গডফাদার ভূমিদস্যু মিজুর নামে ফৌজদারি মামলার বিবরণ (পিসিপিআর অনুযায়ী): উল্লেখ্য যে, নাগেশ্বরী উপজেলার গোলেরহাট নামক গ্রামের বাসিন্দা নুর জামালের মেয়ের সাথে ১নং আসামি মিজানুর রহমান মিজুর ছোট ভাই রিপনের বিয়ের দিন কনের চেহারা খারাপ বলে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে দুই পক্ষের মাঝে বিবাদ বেঁধে যায়। মিজুর স্ত্রী আনজিনা বেগম কনের দাদী তহুরন বেওয়াকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় এবং মিজু খাটের স্ট্যান্ড দিয়ে তহুরনের মাথায় সজোরে আঘাত করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অ্যাম্বুলেন্সে তোলার আগেই তহুরন বেওয়া মারা যায়। যার মামলা নম্বর:
১। জিআর নং-৭৪/২২ (কচাকাটা)
২। জিআর নং-২০৫/২৪ (ভূরুঙ্গামারী) বৈষম্যবিরোধী
৩। জিআর নং-১৭/২৫ (ভূরুঃ) বৈষম্যবিরোধী
৪। জিআর নং-১৩৫/২১ (ভূরুঃ) মাদক
৫। জিআর নং-১০৪/২০ (ভূরুঃ)
৬। জিআর নং-৬৫/২০১৮ (ভূরুঃ)
৭। জিআর নং-০৩/২২
৮। জিআর নং-০৭/২২
৯। এফআইআর নং-১৭/২০১৮
১০। এনজিআর নং-১২১/২৪ (কুড়িগ্রাম)
১১। জিআর নং-১৬০/১৩ (ভূরুঃ)
১২। জিআর নং-৮৬/২০১৭ (ভূরুঃ)
১৩। জিআর নং-১৬/২০১৮
১৪। সিআর নং-১৪৯/১৩ (ভূরুঃ)
১৫। ১৪৮/১৩ (ভূরুঃ)।
জমি দখলের পাশাপাশি মিজু শুরু করে মাদক, মরণব্যাধি নেশার ব্যবসা। যুবলীগের সাইনবোর্ডের পাশে ঝুলিয়ে দেয় ‘মাহি ও মিশু’ নামে আমদানি-রপ্তানিকারক পাথরের ব্যবসার সাইনবোর্ড।
ভারত থেকে আমদানিকৃত পাথরের ট্রাকের ভেতরে পাথরের আড়ালে আনতে থাকে ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ মরণব্যাধি মাদকের চালান। অতি কম সময়ের মধ্যে সোনাহাট স্থলবন্দর ও গোটা সীমান্ত এলাকা জুড়ে গড়ে তোলে মাদকের বিশাল মার্কেট। মিজুর তিন-তিনটি বাড়ি যেন মাদকের কারখানা।
২০১৮ সালে মরণব্যাধি মাদকের ভয়াল ছোবলে দেশ যখন টালমাটাল, তখন আওয়ামী লীগ সরকার মাদকের ছোবল থেকে দেশকে রক্ষার জন্য মাদক আইন সংশোধন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এবং একপর্যায়ে ১০৯ জনকে ক্রসফায়ারে দেয়। এ সময় মিজু ক্রসফায়ার এড়াতে ভারতে পালিয়ে যায়। যাদের সহযোগিতায় মিজু চোর থেকে কুলি, অতঃপর কুলি থেকে কোটিপতি বনে গেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম ভূরুঙ্গামারী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক ও আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সরকার রকিব আহমেদ জুয়েল।
তবে গত রোববার ১ নভেম্বর ভূরুঙ্গামারী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাককে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠিয়েছে পুলিশ।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুর রাজ্জাককে সোমবার কুড়িগ্রাম আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মিজুর বড় ভাই আমিনুর একজন মাদক ও ইয়াবা কারবারি এবং একাধিক মাদক মামলার আসামি। মিজুর ছোট ভাই রাজ্জাক মাদক মামলার আসামি। মিজুর ছোট ভাই রনজু মিয়া মিজুর মাদক ও ইয়াবা কারবারের একান্ত সহযোগী এবং খুনের মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি বলেও অভিযোগসহ নথিপত্র পাওয়া গেছে।
মিজুর স্ত্রী আনজিনা বেগম মাদকসম্রাজ্ঞী এবং খুনের মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি। মিজুর ভাতিজা আতিয়ার রহমান সুজন ও সুমন মিজুর মাদক কারবারের সহযোগী এবং খুনের মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি বলেও জানা গেছে।
এমতাবস্থায়, এলাকাবাসী মিজুর সব অপরাধ কর্মকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে। যেকোনো মুহূর্তে ভুক্তভোগী জনসাধারণ কুখ্যাত মিজুকে গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিতে পারে বলে জানিয়েছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা।












