বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী

স্বাভাবিক মওসুম শেষেও রকমারি জাতের আমের আমদানিতে জমজমাট বিখ্যাত কানসাট বাজার। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার এই কানসাট বাজারে এখনো আমের বেচাকেনা চলছে। এই হাটে এখন পাওয়া যাচ্ছে ৬টি জাতের আম। তবে দাম বেশ চড়া হলেও মওসুমের বাইরে কিছু আমের উৎপাদন বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

মওসুমের অন্যান্য জাতের আমের সময় শেষ হলেও এখন এই বাজারে পাওয়া যাচ্ছে আশ্বিনা, বারি-৪,, গৌড়মতি, খিরসাপাত, কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাঙ্গোর মতো নাবি ও বারোমাসি জাতের আম। প্রতিদিনই এখানে হাজার হাজার মণ আম বেচাকেনা হচ্ছে। মওসুমের শেষ সময়ে নাবি জাতের আমকে ঘিরে বাজারের এমন কর্মচাঞ্চল্য চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। চাঞ্চল্যের বিষয় হলো, বাজারে এখন চলছে খিরসাপাত বা হিমসাগর আমের উৎপাদন ও বেচাকেনা। মওসুম শেষ হওয়ার পরও শিবগঞ্জের কয়েকটি বাগানে গাছে ঝুলছে জিআই স্বীকৃত খিরসাপাত বা হিমসাগর আম। সাধারণত মে-জুন মাসেই বাজারে আসে এ জাতের আম। অথচ পরীক্ষামূলকভাবে আগস্ট মাসে খিরসাপাত উৎপাদন করে দেখিয়েছেন কয়েকজন চাষি। অসময়ে উৎপাদিত এসব আম বিক্রি হচ্ছে মওসুমের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি দামে। কোথাও কোথাও বাগান থেকেই ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা মণ দরে কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন ক্রেতারা। বর্তমানে কানসাট বাজারে আশ্বিনা আম প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বারি-৪ ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, গৌড়মতি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, কাটিমন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে মণ হিসেবে কিনলে দাম কিছুটা কম পড়ছে।

শিবগঞ্জের একজন আমচাষি জানান, আগে মওসুমি আম চাষ করলেও প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছিল না। পরে কাটিমন ও গৌড়মতি আমের চাষ শুরু করা হয়। একই সঙ্গে মওসুমি খিরসাপাতের গাছের জাত পরিবর্তনের জন্য কাটিমন আমের ডাল গ্রাফটিং করা হয়। গ্রাফটিংয়ের পর দেখা যায়, কলম করা ডালে কাটিমন আম ধরলেও পুরোনো গাছের অংশে মুকুল এসেছে। সেই মুকুলের পরিচর্যা চালিয়ে যাওয়ার পর মওসুমের বাইরে সেখানে খিরসাপাত আম ধরে। বর্তমানে সেই আম প্রায় ২৫ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করা হচ্ছে। এই আম চাষি জানান, ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ হাজার টাকার অসময়ের খিরসাপাত আম তিনি বিক্রি করেছেন। আরো দুই সপ্তাহ পর শেষ দফার আম নিয়ে বাজারে আসবেন। ডাল গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে একই গাছে পুরোনো অংশে খিরসাপাত এবং কলম করা ডালে কাটিমন আম পাওয়ার ঘটনাকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন তারা। তবে পদ্ধতিটি এখনো পরীক্ষামূলক। বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নেয়া গেলে আম চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

এদিকে কানসাটের আমের বাজারে নাবি জাতের আমের ভালো দাম পাওয়ায় সন্তুষ্ট চাষিরাও। কাটিমন আম নিয়ে বাজারে আসা একজন চাষি জানান, মওসুমের শেষ মুহূর্তে কাটিমন আম ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় এ দাম সন্তোষজনক। বাজারে আসা ব্যানানা ম্যাঙ্গো নিয়ে এক চাষি জানান, প্রতি মণ বারি-৪ আম প্রায় ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো প্রায় ৮ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। মওসুমের শেষে প্রত্যাশিত দাম পাওয়ায় চাষিরা সন্তুষ্ট। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নাবি জাতের আম নিয়ে প্রতিদিন কানসাট বাজারে আসছেন চাষিরা। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাকে ব্যস্ত হয়ে উঠছে বাজারের আড়তগুলো। সাধারণত আমের দামে প্রতিদিনই কিছুটা ওঠানামা থাকলেও নাবি জাতের আমের ভালো দাম থাকায় বাজারে রয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য।

একজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, চলতি মওসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন। মওসুম শেষের দিকে এসেও নাবি জাতের আমের সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু কয়েক মাসের মওসুমি বাজারের ওপর নির্ভর না করে নাবি জাতের আমের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানির সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হতে পারে। তারা বলেন, অসময়ে খিরসাপাত উৎপাদনের পরীক্ষামূলক সাফল্য বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করে বাণিজ্যিকভাবে সফল করা গেলে আমচাষিদের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র।