চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন খাতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করছে সরকার। অথচ পাঁচ উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও এখান থেকে ঢাকাগামী সরাসরি কোনো আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয়নি। অন্যদিকে মহানন্দা ট্রেনে বগির সংখ্যা কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীসহ সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর, নাচোল, ভোলাহাট এবং নওগাঁর নিয়ামতপুর ও পোরশা উপজেলার মানুষকে। এ অবস্থায় রহনপুর থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন চালু এবং মহানন্দা ট্রেনে আগের মতো বগি সংযোজনের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

রহনপুরের এক কৃতী শিক্ষার্থী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, রহনপুর থেকে খুলনাগামী মহানন্দা ট্রেনে আগে আটটি বগি ছিল। বর্তমানে মাত্র তিনটি বগি নিয়ে ট্রেনটি চলাচল করছে। সকাল ৬টার ট্রেনটিতে গাদাগাদি করে গবাদিপশুর মতো যাত্রীদের যাতায়াত করতে হয়। গাদাগাদি করে রাজশাহী পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অনেক সময় ক্লাস বাদ দিয়ে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের ট্রেনে যেতে হচ্ছে। তিনি মহানন্দা ট্রেনে আগের মতো বগি সংযোজনের দাবি জানান। পাশাপাশি ভবিষ্যতে চাকরিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে রাজধানীতে যাতায়াতের সুবিধার্থে রহনপুর থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন চালুর আহ্বান জানান।

রহনপুর আম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বাবু বলেন, আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর এলাকায় প্রতিবছর কয়েক শ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়। এ ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ জড়িত। এলাকায় প্রায় দেড় শতাধিক আমের আড়ত রয়েছে। প্রতিটি আড়তে কাজ করেন ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক। আম পরিবহনে ট্রাক, ভ্যান, নসিমন-করিমনসহ বিভিন্ন যানবাহনের চালক রয়েছেন ৬০০ থেকে ৭০০ জন। আম ভাঙা, বাছাই ও পরিবহনসহ মৌসুমে সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ ব্যস্ত থাকেন।

এছাড়া আমবাগান পরিচর্যার সঙ্গে সারা বছর কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। এত বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র রহনপুর থেকে ঢাকায় সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন না থাকায় ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত যোগাযোগ সুবিধা পাচ্ছেন না।

রহনপুর স্টেশন বাজার ব্যবসায়ী বহুমুখী কল্যাণ সমবায় সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান বলেন, ঢাকাগামী বনলতা এক্সপ্রেস ধরতে অনেককে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর রাতে বা ফজরের সময় ৩৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর যেতে হয়। আবার কেউ কেউ ৮১ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাজশাহী গিয়ে ঢাকার ট্রেন ধরেন। পাঁচ উপজেলার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র রহনপুরে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন না থাকায় ব্যবসায়ী, চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যোগাযোগ সমস্যার কারণে ঢাকার সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্কও কাঙ্ক্ষিতভাবে গড়ে উঠছে না।

তিনি আরও বলেন, রহনপুর স্টেশন থেকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন খাতে সরকার প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে। এরপরও এ অঞ্চলের মানুষের জন্য ঢাকাগামী একটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হচ্ছে না। দ্রুত এ দাবি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

রহনপুর স্টেশন বাজার ব্যবসায়ী বহুমুখী কল্যাণ সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি নাজমুল হুদা খান রুবেলও এ দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে দেওয়া এক মন্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, রহনপুর থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন চালু এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শুল্কস্টেশন রহনপুরের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত গুরুত্ব বিবেচনায় এ দাবি যৌক্তিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে ৪৪, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ও রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মু. মিজানুর রহমান গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে রহনপুর থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি উত্থাপন করেন। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী সালাউদ্দিন সোহাগ এ-সংক্রান্ত সংসদীয় বক্তব্যের ভিডিও সরবরাহ করেছেন।

রহনপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মির্জা কামরুল হক স্টেশনের সংরক্ষিত রাজস্ব আদায়ের নথি পর্যালোচনা করে জানান, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্টেশনটির যাত্রী ও পণ্য পরিবহন খাতে সম্মিলিত রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৩২ কোটি ৩৩ লাখ ১৪ হাজার ৬২৯ টাকা। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত রাজস্ব আয় হয়েছে ১২ কোটি ৫৬ লাখ ৭০ হাজার ৩৮৯ টাকা।

তিনি জানান, রহনপুর-সিংহাবাদ রেলপথ দিয়ে ভারত থেকে পাথর, পশুখাদ্য, ভুট্টা, গম ও ফ্লাই অ্যাশসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে এ রুট ব্যবহার করে নেপালে সার পরিবহন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও রহনপুর রেলস্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সরেজমিনে রহনপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে বর্তমানে চারটি রেললাইন রয়েছে। এর মধ্যে দুটি লাইন ভারতীয় মালবাহী ট্রেন চলাচলে প্রায় ব্যবহৃত হয়। একটি লাইন দিয়ে রহনপুর-রাজশাহী ও রহনপুর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটের যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। অপর একটি লাইন ইঞ্জিন ঘোরানোর কাজে ব্যবহারের জন্য ফাঁকা রাখা হয়। তবে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে দুটি নতুন লাইন স্থাপন ও ওয়াশপিট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন স্টেশন মাস্টার। বিদ্যমান লাইনগুলোর ব্যবহার ও সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

স্টেশন মাস্টার মির্জা কামরুল হক বলেন, সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মতে, রহনপুর এলাকায় দুটি নতুন রেললাইন স্থাপন এবং ওয়াশপিট নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা সম্ভব হবে না।

জাতীয় সংসদ সদস্য ড. মু. মিজানুর রহমান বলেন, রহনপুর থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবিটি তিনি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করেছেন। শুধু সংসদেই নয়, রেলমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সচিব, উপসচিব, ডিজিএম, জিএমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব রহনপুর পরিদর্শনেও এসেছিলেন। ঢাকায় গেলে বিষয়টির সর্বশেষ অগ্রগতি গুরুত্বের সঙ্গে খোঁজ নেবেন বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, তাঁর প্রচেষ্টায় কমিউটার ট্রেনে একটি নতুন বগি সংযোজন করা হয়েছে। আরও একটি বগি সংযোজনের অপেক্ষায় রয়েছে। মহানন্দা ট্রেনের বগি বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তঃনগর ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে দুটি নতুন লাইন ও ওয়াশপিটের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। এসব অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান হলে আন্তঃনগর ট্রেন চলাচলের পথ সুগম হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পাঁচ উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের এ দাবি বাস্তবায়নে রেলওয়ের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি মহানন্দা ট্রেনে পর্যাপ্ত বগি সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। রহনপুরের বিপুল আমবাণিজ্য, আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন, কর্মসংস্থান এবং যাত্রী চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।