স্টাফ রিপোর্টার

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীরা রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন। গতকাল রোববার বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচিতে দুই শতাধিক প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। তারা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে অবস্থান চালিয়ে যাবেন।

এর আগে সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন চাকরিপ্রার্থীরা। পরে সেখান থেকে একটি মিছিল নিয়ে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে যান এবং দ্রুত নিয়োগপত্র প্রদানের দাবিতে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে সেখান থেকে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সচিবালয়ে যায়। তবে সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়ায় বিকেল ৩টার পর তারা ফিরে আসেন।

প্রতিনিধিদলের সদস্য তানভীর রহমান বাপ্পা জানিয়েছে ,চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাদের দ্রুত নিয়োগপত্র দিতে হবে। এ দাবিতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া আল মামুন বলেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা অধিকারবঞ্চিত হয়েছি। অনেক কষ্ট ও সংগ্রাম করে আমরা এতদূর এসেছি। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হোক।’

রাজশাহীর বাগমারা থেকে আসা প্রার্থী মোসা. খাদিজা বানু ১৫ মাস বয়সী সন্তানসহ এসেছেন। তিনি বলেন, আমার ১৫ মাস বয়সী সন্তান রয়েছে। তবুও দাবি আদায়ের আশায় এসেছি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে আমাদের। রাতে কোথায় থাকব জানি না। রাজপথে থাকার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি।

আন্দোলনকারীদের দাবি,ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়টি মানবিক ও ন্যায়সংগতভাবে পুনর্বিবেচনা করে তাদের নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হোক। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা।

চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের একজন বাপ্পারাজ। তিনি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার আমাদের বাদ দেওয়ার যেই কারণগুলো জানিয়েছেন সেই কারণ দেখিয়ে আমাদের বাদ দেওয়ার অধিকার কি সরকার রাখেন? তিনি বলেন, আমরা এক সরকারের আমলে পরীক্ষা দিয়েছি এবং আপনার আমলে নিয়োগ হচ্ছে বলে শুধু রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে আমাদের বাদ দেওয়া হয়েছে? এই প্রশ্নটাই আপনার কাছে রেখে গেলাম।

তিনি বলেন, আমরা যারা এখানে এসেছি, আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মারামারি করতে আসিনি, কোনো বিশৃঙ্খলা করতেও আসিনি। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য এসেছি।নিয়োগপত্র না নিয়ে আমরা ঢাকা ছাড়ব না।

অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসুর) পক্ষ থেকে সংহতি জানিয়ে সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের বলেন, ‘এখানে যারা আছেন, তাঁদের সবাই পড়াশোনা করেছেন। তাঁরা কেউ কোনো ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন, দেশবিরোধী কোনো কার্যকলাপেও যুক্ত নন কিংবা কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারপরও ভেরিফিকেশন নামক প্রহসনের মধ্য দিয়ে তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা সুস্পষ্ট জুলুম ও অন্যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে কেউ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আসেননি। প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে জুলুমের শিকার হয়েছেন এবং নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা, রাস্তায় নেমে আন্দোলন করার কথা নয়। তাই সরকারের প্রতি আহ্বান, যাঁদের সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে, দ্রুত সেই অন্যায়ের প্রতিকার করুন।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। তবে বিভিন্ন জেলায় শত শত প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি। এতে তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের দাবি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫এর ভেরিফিকেশনে বাদ পড়েছেন ২ হাজারের বেশি প্রার্থী।

সচিবালয়ে সাক্ষাত না পেয়ে শাহবাগে ফিরে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য বলেছেন, ওইখানে (সচিবালয়ে) মন্ত্রী মহোদয়ও উপস্থিত ছিল না, সচিব মহোদয়ও উপস্থিত ছিল না। যখন আমরা কথা বলছি তখন কিন্তু ঠিকই বলছে সচিবের সাথে কথা বলায় দেবে। কিন্তু এমন কোনো কিছুই ঘটে নাই। এটা নিয়ে আমাদের একটা প্রহসন করা হলো।

তিনি বলেন, আমরাও কথা দিয়ে আসছি যে, আমাদেরকে নিয়ে যতই প্রহসন করেন, আমাদের জীবন কিন্তু এমনিতেই শেষ। আজকে চাকরি হবে না মানে, আপনার ভবিষ্যতে আর কোনো সরকারি চাকরি হবে না ভাই। এই ভেরিফিকেশনের রেড মার্ক থানাতেই থাকবে আপনার। আপনি যতই পরিশ্রমী হন, যতই ভালো ছাত্র হন, যতই মেধাবী হন, আপনার চাকরি আর হবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই কথা বলে দিয়ে আসছি ভাই, যে আমাদেরকে... আমরা এমনিতেই শেষ। আপনারা এসে প্রহসন করতেছেন, করেন। কিন্তু আমাদের কাছে যতটুকু আছে, এই জীবনটা আছে, এই জীবন দিয়ে আমরা রাস্তায় পইড়া থাকবো। এই কথাটা আমরা বলে আসছি। তো আপনারা অবস্থান ছাড়বেন না? কারণ এটা আমাদের জীবন-মরণের প্রশ্ন।

আন্দোলনকারীদের দাবি, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও যারা নিয়োগপত্র পাননি, তাদের দ্রুত নিয়োগপত্র দিতে হবে। এ দাবিতে তারা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। ‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক-২০২৫’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ভেরিফিকেশনে সর্বশেষ পাওয়া তথ্যমতে প্রায় ১৫ শতাধিক প্রার্থীর নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি।

বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র না পাওয়ায় এসব প্রার্থীর মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের বিষয়ে শনিবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

সভায় নিয়োগপত্র পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি না ছড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, ১ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেলে পরবর্তী সময়ে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র পাঠানো হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন বা ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া বলেও সভায় জানানো হয়।

গত ৯ জানুয়ারি দেশের ৬১ জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পার্বত্য তিন জেলা বাদে অনুষ্ঠিত ওই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জন প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করা হয়। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫-এর চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। জেলা অনুযায়ী উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের নিয়োগপত্র দেওয়া শুরু হয়। তবে বিভিন্ন জেলায় শত শত প্রার্থী নিয়োগপত্র না পাওয়ায় তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবিতে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা।